Image description

রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে প্রলয়ংকরী বন্যার পানি নেমে গেলেও এখনো জনজীবনে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি। প্রলয়ঙ্করী বন্যার ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই সুপেয় পানির তীব্র সংকট, কর্মসংস্থানহীনতা ও ঘরবাড়ি হারানোর যন্ত্রণায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পুরো বিলাইছড়ি উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ১ হাজার ৯২৮টি এবং ফারুয়া বাজারসহ ক্ষতিগ্রস্ত দোকানপাটের সংখ্যা ২৭৪টি।

ফারুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, এবারের বন্যায় ইউনিয়নের ১৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে ১ হাজার ৪৩৬টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত ৮৫০টি পরিবারকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে এবং ২৫০ পরিবারকে সহায়তা প্রদানের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দুর্গম চাইন্দা পাড়া ও আলিখেং নতুন পাড়াসহ কয়েকটি গ্রাম বাদে প্রায় সব এলাকায় ত্রাণ দেওয়া হয়েছে, বাকিগুলোও পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে।

তবে স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি সহায়তা হিসেবে পাওয়া ১০ কেজি চাল চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। ফারুয়া বাজারসহ আশপাশের দোকানপাট এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। কেবল ত্রাণ দিয়ে এই বিপর্যয় কাটে ওঠা সম্ভব নয় উল্লেখ করে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে টেকসই পুনর্বাসন ও ক্ষতিগ্রস্ত হাট-বাজারসহ বসতিগুলো সুপরিকল্পিত উপায়ে পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

এদিকে বন্যার প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে শিক্ষার পরিবেশ। স্থানীয় বাসিন্দা সুদত্ত তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ফারুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হাঁটুসমান কাদা জমে থাকায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ফারুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে চরাচলের পথ কাদাচ্ছন্ন থাকায় চর্মরোগসহ নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা আশীষ তঞ্চঙ্গ্যা জানান, টানা দ্বিতীয়বারের মতো বন্যায় প্লাবিত হওয়ায় পুরো ফারুয়াবাসীর জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত। এলাকার অধিকাংশ নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। বাধ্য হয়ে অনেকে ঘোলা পানি ফুটিয়ে পান করলেও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।

যমুনাছড়ি বম পাড়ার ধর্মীয় যাজক রেভাঃ রবার্ট বম জানান, তাদের গ্রামের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি তলিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সরকারি বা রাজনৈতিক কোনো নেতৃবৃন্দ পরিদর্শনে যাননি। অতীতে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেও কোনো সাড়া মেলেনি বলে অভিযোগ তুলে তিনি প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও ত্রাণ সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

কৃষিনির্ভর ফারুয়া ইউনিয়নের অর্থনীতিও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এগুজ্যাছড়ি গ্রামের বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা জানান, বন্যায় তার পেঁপে বাগান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। গোয়াইনছড়ি গ্রামের বাসিন্দা সুখীলাল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়ায় তারা চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। আমন ধান পলিমাটিতে ঢেকে যাওয়ায় স্থানীয় কৃষকেরা মূলধন হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

তবে দুর্গত এলাকায় কাজ করে যাচ্ছে সেনাবাহিনী। বিলাইছড়ি সেনা জোনের জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াসাত রহমান ফারুকীর তত্ত্বাবধানে ২নং কেংড়াছড়ি ইউনিয়নে ১১৪টি অসহায় পরিবার এবং সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার মোঃ শামছুল কবীরের তত্ত্বাবধানে শুক্কুরছড়ি আর্মি ক্যাম্পের ব্যবস্থাপনায় ২৪টি পরিবারের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। এই সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সেনা কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ জাকির হোসেন জানান, সরকারিভাবে পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী মজুদ রয়েছে। এলাকাগুলো অতি দুর্গম এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় ত্রাণ পৌঁছাতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। তবে পর্যায়ক্রমে সকল ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।