বাঁশখালীতে পানি নামলেও থামছে না দুর্ভোগ, ক্ষতি প্রায় ২০০ কোটি টাকা
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ৯ দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় এক লক্ষ মানুষ পানিবন্দি ছিল। এতে ঘরবাড়ি, সড়ক, কৃষি, মৎস্য ও বেড়িবাঁধসহ প্রধান সাতটি খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অন্তত প্রায় ২০০ কোটি টাকা। উপজেলা প্রশাসনের করা প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেলে বাঁশখালীর বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনকালে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিকট এই ক্ষয়ক্ষতির তালিকা হস্তান্তর করা হয়।
বাঁশখালীতে ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত ৯ দিন মুষলধারে বৃষ্টি হয়। এর সঙ্গে পাহাড়ি ঢল যুক্ত হয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। বেশ কয়েকটি স্পটে পাহাড় ধসের ঘটনাও ঘটে। ১২ জুলাইয়ের পর বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এখনো অনেক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বন্যার পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির ও দুর্ভোগের চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। পানিবাহিত রোগ ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যায় পানিতে ডুবে ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আসবাহার বেগম (৩৫) ও মরিয়ম বেগম (১৮) নামে দুই নারীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া অন্তত ২০ থেকে ৩০ জন আহত হয়েছেন এবং সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন ২১ জন।
সরকারিভাবে শুকনো খাবার ও চাল বিতরণের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এলেও সমন্বয়হীনতার কারণে ত্রাণের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। কালীপুর পালগ্রাম ইজ্জত নগর এলাকার বাসিন্দা গুলজার বেগম জানান, গত বুধবার রাতে ঘরে পানি ঢোকায় ৪ সন্তান নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। ৫ দিন ধরে শুধু শুকনো খাবার খেয়ে বেঁচে আছেন। বন্যাকবলিত মানুষের দাবি—এখন ত্রাণের চেয়ে ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য পুনর্বাসন সামগ্রী বেশি প্রয়োজন।
উপজেলায় এ পর্যন্ত ১০ হাজার ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৭ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার ও ১৭৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ১ লক্ষ ৩০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ১০০টি হাইজিন বক্স, ১৫৬টি জেরিকেন পানি ও পর্যাপ্ত খাবার স্যালাইন বিতরণ করা হয়েছে। মজুদ রাখা হয়েছে আরও ২শ প্যাকেট শুকনো খাবার ও নতুন বরাদ্দ পাওয়া ৫০ মেট্রিক টন চাল।
খাতওয়ারি বিস্তারিত ক্ষয়ক্ষতি:
মৎস্য খাত: উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তৌসিব উদ্দিন জানান, ১৪টি ইউনিয়নের ৪ হাজার ২০০ পুকুর এবং ১৮৮০.৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩১০টি চিংড়ি ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। এতে ৫ হাজার খামারির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
প্রাণিসম্পদ: উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ জুয়েল মজুমদার জানান, ঢলের পানিতে ১ হাজার ২৭০টি গবাদি পশুর খামার ও ৭৪০টি পোল্ট্রি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি খাত: উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার জানান, ১ হাজার ১০০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি, ২ হাজার ২৩৫ হেক্টর আউশ, ৫৫ হেক্টর আমন বীজতলা, ২০ হেক্টর পেঁপে, ২০ হেক্টর আদা, ৬.৫ হেক্টর হলুদ এবং ১০ হেক্টর পানের বরজসহ মোট ৩ হাজার ৪৪৬.৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ২৬ হাজার ৮০০ জন কৃষকের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড: উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল জানান, ১৪৯.৮৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অন্তত ২৩টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে বড় ভাঙন ১১টি। গন্ডামারা ইউনিয়নে ৫০০ মিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৭০টি স্লুইসগেটের মধ্যে ১১টি সম্পূর্ণ অচল এবং ৪৬টি ঝুঁকিপূর্ণ। নদী ও অভ্যন্তরীণ বাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতে দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ কোটি টাকা।
এলজিইডি (অবকাঠামো): উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইফরাদ বিন মুনির জানান, ৫৮টি রাস্তা, ৬০টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বমোট ১০৯ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রাথমিকভাবে ১৫ কোটি ৭ লক্ষ টাকার ক্ষতির হিসাব করা হয়েছে। শেখেরখীল, বাহারছড়া ও গন্ডামারা এলাকায় পানি নেমে গেলে এই পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
বসতবাড়ি: বন্যায় উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের প্রায় ৫৪টি ওয়ার্ড প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ১১ হাজার ১১০টি বসতবাড়ি প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমীন বলেন, ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত ৯ দিনে ৪১২ মিলিমিটার অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে এই ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন এবং ক্ষয়ক্ষতির তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম বলেন, অসাধু সিন্ডিকেট মৎস্য প্রকল্পের আড়ালে সরকারি স্লুইসগেটগুলো বন্ধ রাখায় পানি জমে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হয়েছে। এছাড়া গত ১৭ বছর জলকদর খাল খনন না করায় এই বিপর্যয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা ২০টি স্থানে বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছি এবং অকেজো স্লুইসগেট সংস্কারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments