স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রি, ব্যাংক ঋণ আর আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করা টাকায় তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন বিশাল এক ফলের বাগান। স্বপ্ন ছিল—এই বাগানই ঘোচাবে পরিবারের অভাব, আনবে সচ্ছলতা। কিন্তু টানা ৯ দিনের ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে আসা বানের পানি সেই স্বপ্নকে কেবল দীর্ঘশ্বাসে পরিণত করেছে। কক্সবাজারের রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের কৃষক জয়নাল আবেদীনের (৪২) ২০ লাখ টাকার বিনিয়োগ এখন পানির নিচে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ছয় একর জমিতে লাগানো প্রায় দুই হাজার পেঁপে গাছ আর ৫০০টি বরই গাছ পচে মরে গেছে। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় গাছগুলো এখন নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কৃষক জয়নাল আবেদীন তার ঘাম আর শ্রমের ফসল হারিয়ে এখন দিশেহারা। তার সামনে এখন শুধু পাহাড়সম ঋণের বোঝা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
ভুক্তভোগী কৃষক জয়নাল আবেদীন জানান, ৮ মাস আগে ৬ একর জমি লিজ নিয়ে তিনি এই আধুনিক বাগানটি গড়ে তুলেছিলেন। প্রতিটি পেঁপে চারা ৫০ টাকা করে কিনে দিন-রাত পরিশ্রম করেছিলেন। তিনি বলেন, “আমার সব শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে ১৫ লাখ টাকার বেশি ঋণ রয়েছে আমার মাথায়। সরকার যদি আর্থিক সহায়তা না দেয়, তবে আমার ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো পথ নেই।”
জয়নালের এই ক্ষতি কেবল তার একার নয়, বাগানটি নষ্ট হওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন সেখানে কাজ করা নিয়মিত শ্রমিকরাও। নারী শ্রমিক কুলসুমা বেগম বলেন, “মালিকের সাথে সাথে আমরাও কাজ হারিয়ে বিপদে পড়েছি। বাগানটি নষ্ট হওয়ায় আমাদের পেটে লাথি লেগেছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের জানান, জয়নাল আবেদীন একজন অত্যন্ত পরিশ্রমী কৃষক। তাকে দেখে এলাকার অনেক তরুণ কৃষিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ তার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
রামু উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, অতিবৃষ্টি ও বন্যায় কেবল জয়নাল নন, উপজেলার আউশ ধান, আমন বীজতলা এবং শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি অফিসের তথ্যমতে, প্রায় ২ হাজার ৯০০ আমন চাষি এবং ১ হাজার ৬৫০ জন সবজি চাষি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এছাড়াও পানচাষিরাও বড় ধরণের ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
রামু উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানজিলা রহমান জানান, “ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা ও সহায়তার আওতায় আনার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহজ শর্তে কৃষি ঋণ এবং বিশেষ পুনর্বাসন প্যাকেজ ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments