বিকেলের শেষ আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়েছে।
ঢাকার পুরোনো একটি গলির ভেতরে ছোট্ট টিনের ছাউনি দেওয়া দোকান। দরজার ওপরে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সাইনবোর্ড—
“মাহবুব আর্ট স্টুডিও”
কখনো এই দোকানের সামনে মানুষের ভিড় লেগে থাকত। নির্বাচনী পোস্টার, নাটকের ব্যানার, বইমেলার ফেস্টুন, দোকানের সাইনবোর্ড—দিনরাত কাজ করতেন শিল্পী মাহবুব হোসেন।
কিন্তু সময় বদলে গেছে।
এখন সবাই কম্পিউটারে ডিজাইন করে।
প্রিন্টিং প্রেসে এক ঘণ্টায় হাজার পোস্টার ছাপা হয়ে যায়।
হাতে তুলি নিয়ে পোস্টার আঁকার মানুষের আর প্রয়োজন নেই।
দোকানের এক কোণে ধুলো জমে আছে রঙের কৌটা। অনেকগুলোর ঢাকনা খুলতেই রঙ পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে।
মাহবুব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “রঙও বুঝি বুড়ো হয়ে যায়।”
তার স্ত্রী রান্নাঘর থেকে বললেন,
— “আজও কোনো কাজ এলো না?”
মাহবুব মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
— “আজ একজন এসেছিল। একটা ফ্লেক্সের ডিজাইন কম্পিউটারে করে দিতে বলল। আমি বললাম, সেটা পারি না। আর এল না।”
স্ত্রী কিছু বললেন না।
দুজনেই জানতেন, সংসারটা এখন ছেলে রাকিবের চাকরির টাকাতেই চলছে।
যে হাত একদিন থামেনি
২০২৪ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে মাহবুবের দোকানের শাটার কখনো পুরোপুরি নামেনি।
দিনে মানুষ আসত রঙ, কাপড় আর তুলি নিয়ে।
রাতে শুরু হতো পোস্টার আঁকা।
কেউ স্লোগান লিখত।
কেউ মানুষের মুখ আঁকত।
কেউ শুধু লাল-কালো রঙে প্রতিবাদের প্রতীক আঁকত।
এক রাতে এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র বলেছিল,
— “চাচা, কাল সকালেই লাগাতে হবে। রাতের মধ্যেই একশোটা পোস্টার হবে?”
মাহবুব হেসেছিলেন।
— “তুলি যতক্ষণ চলে, ততক্ষণ রাত শেষ হয় না।”
সেই রাতে তিনি ভোরের আজান পর্যন্ত পোস্টার এঁকেছিলেন।
হাতের আঙুলে ফোসকা পড়েছিল।
তবু থামেননি।
এক বছর পরে
এখন সেই দোকানে দিনের পর দিন কেউ আসে না।
কখনো পুরোনো কোনো গ্রাহক ভুল করে ঢুকে পড়ে।
ভেতরে তাকিয়ে আবার বেরিয়ে যায়।
দেয়ালে ঝুলছে কয়েকটি পুরোনো তুলি।
সেগুলোও যেন অপেক্ষা করছে।
একদিন দুপুরে দোকানে তিনজন তরুণ-তরুণী ঢুকল।
সবার গলায় ক্যামেরা।
হাতে নোটবুক।
একজন ভদ্রভাবে বলল,
— “চাচা, আপনি কি মাহবুব হোসেন?”
— “হ্যাঁ।”
— “আপনিই কি আন্দোলনের সময় হাতে পোস্টার আঁকতেন?”
মাহবুব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
অনেক দিন কেউ তাকে এই প্রশ্ন করেনি।
তিনি শুধু মাথা নাড়লেন।
তরুণটি ব্যাগ থেকে একটি শক্ত কাগজ বের করল।
পোস্টারটি কিছুটা ছিঁড়ে গেছে।
বৃষ্টিতে রঙ ঝাপসা হয়ে গেছে।
তবু ছবিটা চিনতে ভুল হলো না।
এটা তারই আঁকা।
পোস্টারের নিচে এখনও ছোট্ট করে লেখা আছে—
“মাহবুব আর্ট”
তিনি অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারলেন না।
কাঁপা হাতে পোস্টারটি স্পর্শ করলেন।
— “এটা... কোথায় পেলে?”
এক তরুণী বলল,
— “বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পুরোনো হলের স্টোররুমে। দেয়ালের পেছনে আটকে ছিল।”
মাহবুবের চোখ ভিজে উঠল।
তিনি ফিসফিস করে বললেন,
— “আমি ভেবেছিলাম, এগুলো সব বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গেছে।”
সংগ্রহশালার প্রস্তাব
তরুণরা নিজেদের পরিচয় দিল।
তারা একটি দল গঠন করেছে।
উদ্দেশ্য—২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত সাধারণ মানুষের জিনিসপত্র সংগ্রহ করা।
শুধু বড় নেতাদের স্মৃতি নয়।
একজন চিকিৎসকের স্টেথোস্কোপ।
একজন স্বেচ্ছাসেবকের পানির বোতল।
একজন সাংবাদিকের নোটবুক।
একজন রিকশাচালকের ছেঁড়া গামছা।
আর...
একজন পোস্টার শিল্পীর হাতে আঁকা পোস্টার।
তরুণটি বলল,
— “আমরা চাই, আপনার এই পোস্টারটা সংগ্রহশালায় রাখা হোক।”
মাহবুব বিস্মিত।
— “এই ছেঁড়া কাগজ?”
— “না চাচা। এটা শুধু কাগজ না। এটা একটা সময়ের সাক্ষী।”
শিল্পীর দ্বিধা
সেদিন রাতে মাহবুব ঘুমাতে পারলেন না।
পুরোনো কাঠের বাক্স খুললেন।
একটার পর একটা পোস্টার বের হতে লাগল।
কিছুতে রঙ মুছে গেছে।
কিছুতে ইঁদুর কেটে ফেলেছে।
কিছু একেবারে অক্ষত।
প্রতিটি পোস্টারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি রাত।
একটি মুখ।
একটি গল্প।
একটি ভয়।
একটি আশা।
তিনি ভাবলেন,
“এসব কি সত্যিই ইতিহাস?”
নাকি...
“শুধু পুরোনো কাগজ?”
নাতনির প্রশ্ন
পরদিন বিকেলে তার আট বছরের নাতনি মেহরিন দোকানে এলো।
সে একটি পোস্টার হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “দাদু, এগুলো কি তুমি এঁকেছ?”
— “হ্যাঁ।”
— “কেন?”
মাহবুব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— “কখনো কখনো মানুষ কথা বলতে পারে না। তখন ছবি কথা বলে।”
মেহরিন আবার জিজ্ঞেস করল,
— “তাহলে এখন আর আঁকো না কেন?”
প্রশ্নটা যেন বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধল।
তিনি কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।
নতুন ক্যানভাস
এক সপ্তাহ পরে সেই তরুণরা আবার এল।
তারা শুধু পোস্টার নিতে আসেনি।
তারা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে কয়েকজন স্কুলের শিক্ষার্থী।
একজন বলল,
— “চাচা, আমরা হাতে পোস্টার আঁকা শিখতে চাই।”
মাহবুব অবাক।
— “কম্পিউটারে তো সব হয়।”
একটি ছেলে হাসল।
— “কম্পিউটার ডিজাইন শেখায়। কিন্তু তুলির টান শেখায় না।”
দীর্ঘদিন পর মাহবুব আবার রঙের কৌটা খুললেন।
শুকিয়ে যাওয়া রঙ ফেলে দিলেন।
নতুন রঙ মিশালেন।
একটি সাদা কাগজ টাঙালেন।
হাতে পুরোনো তুলি তুলে নিলেন।
কিছুক্ষণ হাত কাঁপছিল।
তারপর ধীরে ধীরে প্রথম আঁচড়টি টানলেন।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেমেয়েরা নিঃশব্দে দেখছিল।
তারা শুধু ছবি আঁকা দেখছিল না।
তারা একটি হারিয়ে যেতে বসা শিল্পকে বেঁচে উঠতে দেখছিল।
মাহবুব হঠাৎ বুঝতে পারলেন—
প্রতিবাদের শিল্পের কাজ শুধু একটি আন্দোলনের দিনগুলোতে শেষ হয়ে যায় না।
এটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, কোনো সময়ে মানুষ কী স্বপ্ন দেখেছিল, কী নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, আর কীভাবে সাধারণ মানুষের হাতেই ইতিহাসের রঙ লেগে থাকে।
তিনি মৃদু হেসে তুলিটা আবার রঙে ডুবিয়ে দিলেন।
বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে।
কিন্তু “মাহবুব আর্ট স্টুডিও”-তে যেন বহুদিন পর আবার সকাল হলো।




Comments