বঙ্গোপসাগরে স্থাপিত ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি এখনো পুরোপুরি মেরামত না হওয়ায় দেশব্যাপী চলমান গ্যাস সংকটের দ্রুত অবসানের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় মেরামতকাজ চললেও টার্মিনালটি কবে পুনরায় চালু হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেনি পেট্রোবাংলা বা জ্বালানি মন্ত্রণালয়। ফলে আবাসিক, শিল্প ও সিএনজি খাতের ভোগান্তি আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ নেমে এসেছে ২ হাজার ২৬৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। অগ্নিকাণ্ডের আগে দৈনিক ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা গেলেও একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল করতে কত সময় লাগবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বিদেশি প্রকৌশলীরা মেরামতকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং সার্বিক অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
আরপিজিসিএলের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা বিশেষজ্ঞরা শুক্রবার থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরীক্ষা ও মেরামতের কাজ শুরু করেছেন। তবে টার্মিনালটি কবে আবার গ্যাস সরবরাহে যুক্ত হবে, সে বিষয়ে তারাও নিশ্চিত নন।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কারিগরি দল নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। তবে এখনো টার্মিনাল চালুর মতো অবস্থায় আনা সম্ভব হয়নি এবং আরও কিছু সময় লাগতে পারে।
গত মঙ্গলবার এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে ছোট পরিসরের অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তাজনিত কারণে এর কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টার্মিনালটিতে দুটি বয়লার রয়েছে। আগুনে একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যটি সচল করা গেলে অতিরিক্ত প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। মগবাজার, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বনশ্রী, মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, কাফরুল, কলাবাগান, কাজীপাড়া ও পশ্চিম তেজতুরী বাজারসহ অনেক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের চাপ থাকছে না। কোথাও কোথাও পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে অনেক পরিবার গভীর রাতে রান্না করছেন, কেউ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন, আবার নিম্ন আয়ের মানুষ কাঠ বা লাকড়ির চুলায় রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক ছোট হোটেলও বিকল্প হিসেবে এলপিজি বা কাঠের চুলা ব্যবহার করছে।
একই সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক চালক গ্যাস পাচ্ছেন না। আবদুল্লাহপুরের একটি সিএনজি স্টেশনের মালিক রেজাবুদ্দৌজা চৌধুরী জানান, দিনের বেলায় প্রায় কোনো গ্যাসই আসে না। রাতের দিকে সীমিত চাপের গ্যাস দিয়ে অল্পসংখ্যক গাড়িকে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এতে সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকদের আয় কমে যাচ্ছে এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে ব্যয় বাড়ছে।
শিল্প খাতেও সংকটের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় বয়লার চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিকেএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতনসহ অন্যান্য ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে লোকসানের পরিমাণ বাড়বে। প্রয়োজনে সমুদ্রপথের পরিবর্তে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হতে পারে, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।
গ্যাসের ঘাটতির কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট কমে গেছে, ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় এই নির্ভরতা বেড়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের গ্যাস খাত সীমিত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল ছিল। একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেই দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, বিকল্প হিসেবে স্থলভিত্তিক আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল থাকলে বর্তমান সংকটের প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।
এদিকে পেট্রোবাংলা সাময়িক এই দুর্ভোগের জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশি-বিদেশি কারিগরি দল দ্রুততম সময়ে টার্মিনালটি পুনরায় সচল করতে কাজ করছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাস গ্যাসের আওতাধীন এলাকায় সব শ্রেণির গ্রাহককে স্বল্পচাপের গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
Comments