মরুভূমির বুকজুড়ে তখন হাহাকার করছিল এক তৃষ্ণার্ত সভ্যতা। ষষ্ঠ শতাব্দীর আরব উপদ্বীপ যেখানে সূর্যের প্রখরতার চেয়েও তীব্র ছিল মানবতার সংকট। ইতিহাসের পাতায় এই যুগকে চিহ্নিত করা হয়েছে 'জাহিলিয়াত' নামে, অজ্ঞতা আর অন্ধকারের যুগ হিসেবে। সেই সময়ের আরব সমাজের দিকে তাকালে মনে হয় যেন মানবতা নিজেই নির্বাসনে চলে গিয়েছিল বহুদূরে।
গোত্রে গোত্রে বিভক্ত আরব সমাজে তখন রক্তের প্রতিশোধই ছিল একমাত্র আইন। সামান্য একটি উটের কারণে শুরু হওয়া যুদ্ধ চলত চল্লিশ বছর ধরে, যেমনটি ঘটেছিল বিখ্যাত 'হারবুল বাসুস' যুদ্ধে। কাবাঘরের চারপাশে দাঁড়িয়েছিল তিনশো ষাটটি প্রতিমা, মানুষ পাথর ও কাঠ খোদাই করে নিজ হাতে তৈরি করত উপাস্য, আবার নিজেই তার সামনে মাথা নত করত। নারীর মর্যাদা ছিল সবচেয়ে করুণ অধ্যায় কন্যাসন্তানের জন্মসংবাদ শুনলে পিতার মুখ কালো হয়ে যেত লজ্জায়, আর সমাজের কলঙ্কের ভয়ে অসংখ্য পিতা নিজ হাতে জীবন্ত বালিকাকে মাটিচাপা দিতেন, যার হৃদয়বিদারক বর্ণনা পরবর্তীতে কুরআনেও উঠে এসেছে। দাসত্বের নিষ্ঠুর শৃঙ্খলে বন্দি ছিল অগণিত মানুষ, এতিম আর অসহায়দের সম্পদ কেড়ে নেওয়া ছিল দৈনন্দিন ঘটনা, সুদ আর জুয়ার নেশায় আচ্ছন্ন ছিল গোটা সমাজ। মদ ছিল আভিজাত্যের প্রতীক, রক্তপাত ছিল বীরত্বের মাপকাঠি। জ্ঞান, বিজ্ঞান কিংবা ন্যায়বিচারের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সেখানে গড়ে ওঠেনি, বরং তরবারির ধারই নির্ধারণ করত ন্যায়-অন্যায়ের সীমারেখা।
ঠিক এমনই এক ঘোর অমানিশার মধ্যরাতে, ইতিহাস সাক্ষী রাখল এক অবিস্মরণীয় ভোরের। 'আমুল ফিল' বা হস্তীবাহিনীর বছর নামে পরিচিত সেই সময়ে, রবিউল আউয়াল মাসের এক পবিত্র প্রভাতে মক্কা নগরীতে জন্ম নিলেন সেই মহামানব, যাঁর আগমনের কথা ঘোষিত হয়েছিল পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোতেও হযরত মুহাম্মদ সা.। জন্মের পূর্বেই হারিয়েছিলেন পিতাকে, শৈশবেই কেড়ে নিয়েছিল নিয়তি মাতৃস্নেহও। এতিম এই শিশু বেড়ে উঠলেন কঠিন বাস্তবতার কোলে, অথচ তাঁর সততা, ন্যায়পরায়ণতা আর বিশ্বস্ততার সুবাসে গোটা মক্কা নগরী তাঁকে ডাকত 'আল-আমিন' নামে বিশ্বাসযোগ্য মানুষ। চল্লিশ বছর বয়সে হেরা পর্বতের নির্জন গুহায় নেমে এলো ওহির প্রথম বাণী, যা এক লহমায় বদলে দিল মানবসভ্যতার গোটা গতিপথ।
ইতিহাস বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করে, যে সমাজ ডুবেছিল রক্তপাত আর কুসংস্কারের অন্ধকারে, সেই সমাজেই তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন ন্যায়বিচার, মানবতা, নারীর মর্যাদা, দাসপ্রথার অবসান আর ভ্রাতৃত্বের এক অভূতপূর্ব সভ্যতা। মাত্র তেইশ বছরের ব্যবধানে গোত্রে গোত্রে বিভক্ত, রক্তপিপাসু এক জনগোষ্ঠী পরিণত হলো ন্যায়নিষ্ঠ, শিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল এক জাতিতে, যাদের হাত ধরে পরবর্তীতে গড়ে উঠল বিজ্ঞান, দর্শন আর সভ্যতার এক নতুন স্বর্ণযুগ। বিশ্বের বহু অমুসলিম ইতিহাসবিদও এই রূপান্তরকে মানবসভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর অধ্যায় বলে স্বীকার করেছেন।
এই মহান আগমনের স্মৃতি স্মরণ করেই যুগে যুগে ইসলামী পণ্ডিতদের হৃদয় উদ্বেলিত হয়েছে অপার আনন্দে ও কৃতজ্ঞতায়। তাঁদের যুক্তির মূল ভিত্তি কুরআনের সেই ঘোষণা, যেখানে আল্লাহ নবীজি সা. কে অভিহিত করেছেন সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত হিসেবে। যে আগমন রহমতস্বরূপ, তাকে স্মরণ করে আনন্দ প্রকাশ করা তাঁদের চোখে ঈমানেরই স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ। এই দর্শনকে ভিত্তি করে মধ্যযুগের অগ্রগণ্য হাদিসবিশারদ ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এবং তাঁরই উত্তরসূরি বিশ্বনন্দিত আলেম ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি রহ. নিজ নিজ গ্রন্থে বিস্তারিত শরয়ি দলিলপ্রমাণসহ মত দিয়েছেন যে, নবীজির শুভ আগমন স্মরণে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা শরিয়তসম্মত ও প্রশংসনীয় একটি কাজ, যাকে তাঁরা অভিহিত করেছেন 'বিদআতে হাসানাহ' বা কল্যাণকর নতুন প্রথা নামে।
বর্তমান যুগেও বিশ্বের অসংখ্য প্রথিতযশা আলেম এই অভিমতকে সমর্থন করে চলেছেন। বিশ্বের প্রাচীনতম ও মর্যাদাপূর্ণ ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু মুফতি, দক্ষিণ এশিয়ার সুন্নি ও বেরলভি ধারার শীর্ষস্থানীয় আলেমগণ, তুরস্ক-সিরিয়া-মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী সুফি সাধকদের একটি বিশাল অংশ একবাক্যে বলেন নবীজি সা. এর আগমনে আনন্দ প্রকাশ করা, তাঁকে স্মরণ করে মাহফিলের আয়োজন করা, আর সেই উপলক্ষে দান-সদকা কিংবা ভালো কাজে অংশ নেওয়া সম্পূর্ণ বৈধ, বরং তাতে রয়েছে সীমাহীন কল্যাণের সম্ভাবনা। তাঁদের মতে, মিলাদ মাহফিলে যখন হাজারো কণ্ঠ একসঙ্গে নবীজি সা. এর জীবনী, তাঁর শৈশব, তাঁর মহানুভবতা আর তাঁর শিক্ষার কথা স্মরণ করে, তখন তা নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে গেঁথে দেয় নবীপ্রেমের চিরস্থায়ী বীজ।
বাংলাদেশের মাটিতে এই ঐতিহ্য পেয়েছে এক অনন্য রূপ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী ঈদে মিলাদুন্নবী সা. কে পালন করে আসছেন জাতীয় ছুটির দিনের মর্যাদায়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তে নামে বিশাল জুলুস, পতাকা আর আলোকসজ্জায় সেজে ওঠে অলিগলি, মসজিদ প্রাঙ্গণ উপচে পড়ে নবীপ্রেমী মানুষের ঢলে। শিশু থেকে বৃদ্ধ, ধনী থেকে দরিদ্র সবাই একই সুরে গেয়ে ওঠেন নবীজি সা. এর প্রশস্তি, একই আবেগে সিক্ত হয় সবার হৃদয়। এই মহোৎসব তাই আর কেবল ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ নেই, তা মিশে গেছে বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির রক্তে-মজ্জায়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে চলেছে নবীপ্রেমের অমর বার্তা।
সমর্থক আলেমরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরেন হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, সোমবার দিনটির তাৎপর্য প্রসঙ্গে স্বয়ং নবীজি সা. উল্লেখ করেছিলেন যে এই দিনেই তাঁর জন্ম হয়েছিল। এই বর্ণনাকে ভিত্তি করে বহু পণ্ডিত মনে করেন, নিজ জন্মদিনের বিশেষত্ব নবীজি সা. নিজেই ইঙ্গিত করে গেছেন, আর তাই সেই স্মরণকে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে আরও সংগঠিত ও ব্যাপক রূপ দেওয়া তাঁদের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও যুক্তিসংগত একটি বিষয়।
ন্যায্যতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে উল্লেখযোগ্য যে, সালাফি ও দেওবন্দি ধারার একাংশ আলেম এই সুনির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁদের যুক্তি, নবীজি স্বয়ং কিংবা তাঁর সাহাবিরা নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতায় এই দিন উদযাপন করেননি, তাই নতুন কোনো ধর্মীয় প্রথা সংযোজন থেকে বিরত থাকাই তাঁদের কাছে শ্রেয়তর পথ। তবে ইতিহাসের বিশাল প্রেক্ষাপট, কোটি কোটি মুসলিম হৃদয়ে গেঁথে থাকা এই ভালোবাসার গভীরতা, আর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই ঐতিহ্য প্রমাণ করে দেয় অন্ধকার আরবের বুকে জন্ম নেওয়া সেই আলোর দূতের স্মরণ আজও মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে জ্বলছে এক নিভৃত প্রদীপের মতো, যার আলো কখনো নিভে যাওয়ার নয়।
লেখক ও কলামিস্ট শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো,মিশর




Comments