Image description

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ব্যবহারের জন্য বুলগেরিয়ার একটি বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজ মোতায়েনের খবরে কয়েক সপ্তাহ ধরে আতঙ্কে ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

তাদের আশঙ্কা ছিল, মার্কিন সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব বুলগেরিয়ার তাদের গ্রামটি ইরানের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

তবে শনিবার স্থানীয় বাসিন্দারা কিছুটা স্বস্তির খবর পান। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর দুটি জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ বুলগেরিয়ার বেজমের বিমানঘাঁটি ছেড়ে চলে যায়।

বুলগেরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী দিমিতার স্তোয়ানোভ বলেন, “মার্কিন বিমানবাহিনীর জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজগুলো উড্ডয়ন করে বুলগেরিয়া ছেড়ে গেছে।”

দেশটির প্রেসিডেন্ট ইলিয়ানা ইয়োতোভাও বলেন, “আপাতত এই মিশন শেষ হয়েছে।”

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের যুদ্ধে সহায়তার জন্য মোতায়েন করা বোয়িং কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাংকারগুলো অন্য ‘অপারেশনাল প্রয়োজন’ মেটাতে বুলগেরিয়া ছেড়েছে।

কিন্তু উড়োজাহাজগুলো চলে গেলেও বেজমের বাসিন্দাদের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব তাদের এলাকায় আবারও পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা এখনও রয়েছে।

ইরানের হুঁশিয়ারিতে আতঙ্ক
বুলগেরিয়াকে আগে থেকেই সতর্ক করেছিল তেহরান। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়ার জন্য সোফিয়াকে সতর্ক করেছিল ইরান।

এরপর ব্রিটিশ সংবাদপত্র ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক অভিযান আরও বাড়ালে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলার সম্ভাবনা বিবেচনা করেছিল ইরানি বাহিনী। এর মধ্যে বুলগেরিয়ার বেজমের বিমানঘাঁটিও ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বেজমের বিমানঘাঁটি থেকে মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ পরিচালনার অনুমোদন দেওয়ার পরই এই আশঙ্কা আরও বাড়ে।

বিমানগুলো চলে যাওয়ার কয়েক দিন আগে স্থানীয় একটি মুদি দোকানে কাজ করা এক নারী বলেন, “আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, আমাদের গ্রামে যেন হামলা না হয়। আমরা ভীত, কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের কিছুই করার নেই।”

এক হাজার মানুষের গ্রাম, চারদিকে সামরিক বিমান
বেজমের প্রায় এক হাজার মানুষের একটি ছোট গ্রাম। বিমানঘাঁটির পাশেই এর অবস্থান। দীর্ঘদিন ধরে বুলগেরিয়ার সামরিক উড়োজাহাজ এ গ্রামের আকাশে ওড়াউড়ি করে আসছে। স্থানীয় মেয়র রোজেন রুসেভের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামের অনেক বাসিন্দাই বিমানঘাঁটিতে কাজ করেন। ফলে আকাশে সামরিক বিমানের শব্দ তাদের কাছে নিত্যদিনের ঘটনা।

কিন্তু গত জুলাইয়ের শেষ দিকে পরিস্থিতি বদলে যায়। বুলগেরিয়া সরকার সর্বোচ্চ আটটি মার্কিন বিমানবাহিনীর কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাংকার এবং ২৫০ জন পর্যন্ত মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা মোতায়েনের প্রস্তাব দেয়। পরে দেশটির পার্লামেন্টও এ প্রস্তাব অনুমোদন করে।

এর মাত্র দুই দিনের মধ্যে বেজমের ও আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা ওই মোতায়েনের প্রতিবাদে ৩ হাজারের বেশি স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। তারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভও করেন।

তাদের মূল দাবি ছিল—তাদের গ্রামকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে কোনওভাবেই জড়িয়ে ফেলা যাবে না।

বিমান চলে যাওয়ায় স্বস্তি
শনিবার যখন বাসিন্দারা জানতে পারেন, মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানগুলো বেজমের ছেড়ে গেছে, তখন গ্রামজুড়ে স্বস্তির আবহ তৈরি হয়।

মেয়র রোজেন রুসেভ বলেন, “এখন তাদের মনে হচ্ছে, অবশেষে তাদের কণ্ঠস্বর শোনা হয়েছে। ঠিক যেভাবে তারা চেয়েছিলেন, সেভাবেই ঘটেছে।”

সরকারও এর আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিল। প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্তোয়ানোভ জানিয়েছিলেন, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জাতীয় নিরাপত্তা, মার্কিন উড়োজাহাজ কিংবা বুলগেরিয়ায় থাকা অন্যান্য স্থাপনার বিরুদ্ধে কোনও হুমকি শনাক্ত করেনি।

সরকারের অনুরোধে যুক্তরাজ্যের একটি মূল্যায়নেও হামলার ঝুঁকি ‘অত্যন্ত কম’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

তবে এসব আশ্বাসে সবাই আশ্বস্ত হননি।

আমরাই প্রথম লক্ষ্যবস্তু
তাপমাত্রা যখন প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, তখন গ্রামের দুই বাসিন্দা ৬৭ বছর বয়সী দিনকা তোদোরোভা ও ৭৮ বছর বয়সী গানকা ভ্লায়েভা ছায়ায় বসে ছিলেন। তাদের দু’জনেরই সন্তান বেজমের বিমানঘাঁটিতে কাজ করেন।

ভ্লায়েভা বলেন, “আমরা প্রতিদিন কাঁপতে থাকি এবং প্রার্থনা করি, যুদ্ধ যেন এখানে না আসে। আমরাই প্রথম লক্ষ্যবস্তু। অনেক মানুষ মারা যাবে।”

পাশ থেকে তোদোরোভা ধীরে যোগ করেন, “শিশুরাও। লোভীদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য।”

সরকার ও আইনপ্রণেতাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে ভ্লায়েভা বলেন, তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের আবেদন উপেক্ষা করেছেন।

“যারা তাদের নির্বাচিত করেছেন, সেই মানুষের কণ্ঠ তারা শুনতে চান না,” বলেন তিনি।

তবে গ্রামের সবাই যে ইরানের হামলার আশঙ্কায় আতঙ্কিত, তা নয়।

৩৩ বছর বয়সী ইভান নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘ভিত্তিহীন আতঙ্ক’ দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তার মতে, গ্রামের জন্য কোনও বাস্তব ঝুঁকি নেই।

বরং তার উদ্বেগ অন্য জায়গায়—আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য উপস্থিতি কিংবা কৃষ্ণসাগরের দিক থেকে রাশিয়া থেকে কোনও কিছু আসার আশঙ্কা।

শিশুদের মানসিক চাপ কমাতে আয়োজন
মার্কিন উড়োজাহাজ মোতায়েনের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের প্রতিবাদের সময়ও গ্রামের বাসিন্দারা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছেন।

বিমানঘাঁটিতে কর্মরত এক সেনাসদস্যের মেয়ে আন্তোনিয়া ইভানোভা বেজমের একটি আকাশচিত্রের ওপর সাদা কাপড় টানিয়ে দেন। পরে সেখানে শিশুদের জন্য অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়।

তিনি বলেন, এর উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের মধ্যে জমে থাকা মানসিক চাপ কিছুটা কমানো।

“এই পুরো পরিস্থিতিতে আমরাই সবচেয়ে নির্দোষ। আমরা আমাদের বাড়ির কাছে ওই বিমানগুলো চাইনি,” বলেন তিনি।

বিকাল গড়িয়ে তাপমাত্রা কমতে শুরু করলে গ্রামের খেলার মাঠে শিশুরা জড়ো হয়। গ্রামের বাসিন্দা ও এক শিশুর মা সনকা মস্কোভা বলেন, “হয়তো হামলার কিছুটা সম্ভাবনা আছে, কিন্তু আমার মনে হয় গণমাধ্যম বিষয়টিকে বাড়িয়ে দেখাচ্ছে। যা হওয়ার হবে। আমাদের ওপর যারা আছেন, সরকারই সিদ্ধান্ত নেয়। দায়ও তাদের।”

এ সময় নিচু দিয়ে বুলগেরিয়ার একটি সামরিক হেলিকপ্টার উড়ে গেলেও কেউ আকাশের দিকে তাকায়নি। সামরিক বিমান তাদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছে।

তথ্যের ঘাটতিতে বাড়ছে উদ্বেগ
বেজমের-এর মেয়র রোজেন রুসেভ বলেন, গ্রামবাসীর প্রতিবাদ সরকারের পতন ঘটানোর কোনও প্রচেষ্টা ছিল না। তাদের দাবি ছিল, সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।

তিনি বলেন, “বিমানগুলো এখানে থাকলে সম্ভাব্য হুমকি কী হতে পারে এবং আমাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কী—আমরা শুধু এ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য চেয়েছিলাম।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলেও জানান তিনি। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা হাজারো মন্তব্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করলেও অনেক মন্তব্য ছিল অনুমাননির্ভর এবং আতঙ্ক ছড়ানোর মতো।

বিমানঘাঁটি ও আশপাশের এলাকায় সামরিক পুলিশ টহল দেওয়ায় কারও মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়েছে, আবার কারও কাছে পরিস্থিতি আরও ভীতিকর মনে হয়েছে।

বুলগেরিয়ায় ইরানের হামলার আশঙ্কা কতটা?
বুলগেরিয়া ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যে পড়লেও কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, বুলগেরিয়া বা ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের অন্য কোনও স্থানে সফল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা ইরানের নাও থাকতে পারে। একই সঙ্গে এমন হামলা চালানোর প্রকৃত ইচ্ছাও তেহরানের নেই বলে মনে করেন তারা।

বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী রুমেন রাদেভও সোমবার বলেন, মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানগুলো বেজমের বিমানবন্দর থেকে ‘দক্ষিণ দিকে’ একটিও উড্ডয়ন করেনি। বরং এগুলো ন্যাটোর সদস্য অন্যান্য দেশে প্রশিক্ষণ ও মহড়ায় অংশ নিতে গিয়েছিল।

তবে একই দিনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘সামরিক আগ্রাসনকে সমর্থনকারী’ হিসেবে বিবেচিত যেকোনও পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তেহরান সংরক্ষণ করে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, “বুলগেরিয়ার জনগণের সঙ্গে আমাদের কোনও সমস্যা নেই।”

তিনি বলেন, কয়েকটি জ্বালানি সরবরাহকারী সামরিক উড়োজাহাজ বুলগেরিয়ার ভূখণ্ড ছেড়ে গেছে—এ তথ্য আগেই জানানো হয়েছিল এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনেও তা নিশ্চিত হয়েছে।

বাঘাইয়ের অভিযোগ, বুলগেরিয়ার অনেক নাগরিক ও রাজনীতিকও স্বীকার করেছেন যে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনে সহায়তার শামিল।

ভয় থাকলেও ঈশ্বরের ওপর আস্থা
বেজমেরে এখনও ইরানের হুমকি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে গ্রামের এক নারী বললেন, তিনি ভয় পাচ্ছেন না। পরিচয় বা ছবি প্রকাশ করতে রাজি না হওয়া ওই নারী বলেন, “আমি মোটেও ভয় পাচ্ছি না। ঈশ্বর আমাদের নিরাপদে রাখছেন।”

এরপর বাইবেলের একটি পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, “আমি শুয়ে শান্তিতে ঘুমাই, কারণ একমাত্র আপনিই, হে প্রভু, আমাকে নিরাপদে বাস করতে দেন।”

মার্কিন উড়োজাহাজগুলো আপাতত বেজমের ছেড়ে গেলেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ভূরাজনৈতিক অভিঘাত যে এই ছোট্ট বুলগেরীয় গ্রামটির মানুষের জীবনেও গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, তা স্পষ্ট। যুদ্ধের সরাসরি অংশ না হয়েও নিজেদের ভূখণ্ডে মিত্র দেশের সামরিক তৎপরতার কারণে সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কায় দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের।
সূত্র: আল-জাজিরা
এমআর