শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক অটুট থাকলে সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব: ইউজিসি চেয়ারম্যান
গবেষণায় সমন্বিত অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে: মামুন আহমেদ
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক সম্পর্ক অটুট থাকায় নানা সংকট ও উত্তাল পরিস্থিতির পরও অল্প সময়ের মধ্যে স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রমে ফেরা সম্ভব হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উত্তাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক দৃঢ় ছিল, সেসব প্রতিষ্ঠানে দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। আর যেখানে এ সম্পর্ক অটুট ছিল না, সেখানে এখনো নানা সমস্যা রয়ে গেছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রুয়েটের বিশ্ববিদ্যালয় দিবস (প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী) উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা, চিত্রাঙ্কন প্রদর্শনী ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সার্টিফিকেট দেয় না’
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীকে শুধু সার্টিফিকেট প্রদান করে না। জীবনে চলার জন্য, সমাজের জন্য এবং সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তার প্রাথমিক শিক্ষাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া যায়। নৈতিক শিক্ষা, পারস্পরিক বন্ধন এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষাও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি বলেন, রুয়েট সেই পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে। রুয়েটের ক্যাম্পাস অনেক শান্ত ও স্নিগ্ধ। এখানকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গবেষণার প্রতি আগ্রহী এবং তারা গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা চান।
গবেষণায় অর্থের অভাব নেই, প্রয়োজন সমন্বয়
গবেষণার জন্য দেশে অর্থের অভাব নেই উল্লেখ করে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়েই কোনো না কোনোভাবে গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ রয়েছে। তবে এসব অর্থ ও উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। আর এ কারণেই গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ নেই বলে মনে হয়।
তিনি বলেন, এ সমস্যা সমাধানে ইউজিসি ‘রিসার্চ রিপোজিটরি ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মাধ্যমে কোথায় গবেষণার প্রয়োজন, কোন কোন বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া দরকার এবং গবেষণার জন্য অর্থের উৎস কোথায়—এসব বিষয় চিহ্নিত করা হবে। এতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশি উপকৃত হবে।
গবেষণার লক্ষ্য হতে হবে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন
গবেষণা শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশ, সাইটেশন বাড়ানো কিংবা ব্যক্তিগত গবেষণা-প্রোফাইল সমৃদ্ধ করার জন্য নয় বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক মামুন আহমেদ। তিনি বলেন, গবেষণার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন এবং দেশের বাস্তব সমস্যার সমাধান।
দেশের ছোট-বড় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে গবেষণার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে ইউজিসির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দেন।
প্রকৌশল শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতাও জরুরি
গবেষণা ও প্রকৌশল শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, মেধাবীরাই প্রকৌশলী হন। সবচেয়ে মেধাবীরা যখন প্রকৌশলী বা চিকিৎসক হন, তখন তাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি থাকে। তারা হবেন দুর্নীতিমুক্ত ও নৈতিক মানুষ—এটাই সমাজের প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, প্রকৌশল শিক্ষার পাশাপাশি একজন প্রকৌশলীকে সমাজের সঙ্গে বন্ধন তৈরির শিক্ষা এবং নৈতিকতার মানদণ্ডে অবিচল থাকার শিক্ষাও অর্জন করতে হবে।
রুয়েটে গবেষণা সুবিধা বাড়ানোর প্রশংসা
রুয়েটে গবেষণার সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি ওঠার বিষয়টির প্রশংসা করে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানোর দাবি বেশি শোনা যায়। কিন্তু রুয়েটে গবেষণার পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক।
তিনি বলেন, গবেষণাগার স্থাপন, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন এবং গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণে ইউজিসি সহযোগিতা করবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন, মেকানিক্যাল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলাম, সিভিল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. কামরুজ্জামান, অ্যাপ্লাইড সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুল কাদের জিলানী এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. বশির আহমেদ।
স্বাগত বক্তব্য দেন রুয়েটের ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলাম সরকার। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিভাগের প্রধান, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে সকালে রুয়েট প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অবস্থিত শহীদ শিক্ষার্থীদের কবর জিয়ারত এবং তাঁদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া করা হয়। ক্যাফেটেরিয়ায় গবেষণা পোস্টার ও স্টার্টআপ মডিউল প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। দুপুরে যোহরের নামাজ শেষে রুয়েটের অগ্রযাত্রা এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।




Comments