তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার পরই আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ, উঠছে প্রশ্ন
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার ঘোষণার পরপরই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারতের আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। ঘটনাগুলোর সময়গত মিলকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠলেও, এর পেছনে রাজনৈতিক কোনো সম্পর্ক রয়েছে—এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
গত ১০ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ঘোষণা দেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে যাচ্ছেন না। এর পরদিনই ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ৮০০ মেগাওয়াট ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যায়।
এর ফলে কেন্দ্রটির উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। একই সময়ে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বেও তিনি অংশ নিচ্ছেন না।
ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন বলেও জানিয়েছে বাংলাদেশ।
আগে থেকেই চাপে ছিল বিদ্যুৎব্যবস্থা
আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার আগেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা চাপের মধ্যে ছিল। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটের কারণে দেশের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছিল না।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে আদানি পাওয়ার জানিয়েছিল, ভারতের রেলপথে জট ও কয়লা পরিবহনে বিধিনিষেধের কারণে গোড্ডা কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দিনের অফ-পিক সময়ে উৎপাদন কমিয়ে সন্ধ্যার চাহিদার সময় সরবরাহ ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল।
১১ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, আদানির কেন্দ্রটি আগের রাতে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করলেও একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়।
কেন্দ্রটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বয়লারের একটি সমস্যার কারণে ইউনিটটি বন্ধ হয়েছে এবং সেটি ঠাণ্ডা হতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। পিডিবির এক সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনিটটির একটি ফিড ইউনিটে সমস্যা দেখা দেয়। অতিরিক্ত উত্তপ্ত হওয়ার কারণে সেটি বন্ধ করতে হয়। মেরামতের আগে ইউনিটটি ঠাণ্ডা করতে হবে এবং পুরোপুরি উৎপাদনে ফিরতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে।
আদানি পাওয়ারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংকটের কারণ রাজনৈতিক নয়; প্রথমে কয়লা পরিবহনজনিত সমস্যা এবং পরে কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন কমেছে।
২০১৭ সালের চুক্তি, ২৫ বছরের দায়
আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হয়েছিল ২০১৭ সালে। কেন্দ্রটির মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিটের প্রতিটির সক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটি মূলত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্যই পরিচালিত হচ্ছে।
এটি বর্তমান সরকারের করা চুক্তি নয়। আগের সরকারের সময়ে করা দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি বহাল রেখেই বাংলাদেশ বিদ্যুৎ কিনছে। তাই চুক্তিগত দায়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি সংগ্রহ, উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা এবং নির্ধারিত সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে কী ধরনের দায় রয়েছে, তা চুক্তির নির্দিষ্ট ধারা পর্যালোচনা করেই মূল্যায়ন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আদানি চুক্তির বিভিন্ন দিক আগেই পর্যালোচনার দাবি তুলেছে। তবে বিরোধ বা চুক্তি লঙ্ঘনের পরিস্থিতিতে পুনর্বিবেচনা বা প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে কি না, তা চুক্তির ধরন ও শর্তের ওপর নির্ভর করে।
সময়ের মিলেই যত প্রশ্ন
আগস্টে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়ে আলোচনা চলছিল। ১৬ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, শেখ হাসিনার দিল্লি থেকে দেওয়া প্রকাশ্য বক্তব্যে সফর-প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরের আগে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন।
৫ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা নেই এবং সফরের তারিখও চূড়ান্ত হয়নি।
১০ সেপ্টেম্বর ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করে দেয়, তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না। এর পরদিনই সামনে আসে আদানির গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর।
ঘটনার এই সময়গত নৈকট্য সন্দেহ তৈরি করলেও সন্দেহ আর প্রমাণ এক বিষয় নয়। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য নথি বা নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ভারত সরকার বা আদানি পাওয়ার ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেছে।
বিদ্যুৎ কি কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার হতে পারে?
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে অনেকটাই আমদানিনির্ভর। গ্যাস সংকটের কারণে দেশের বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। এ অবস্থায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের একটি আন্তদেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম এর আগে বলেছেন, আদানি চুক্তিতে গুরুতর অসাম্য থাকলে সেটি পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলমও চুক্তিটিকে একতরফা হিসেবে সমালোচনা করে পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
তবে বর্তমান সংকট শুধু আদানির কারণে তৈরি হয়নি। আদানির ইউনিট বন্ধ হওয়ার আগেই গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটে দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা চাপে ছিল। ১১ সেপ্টেম্বরের গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, সামগ্রিক উৎপাদন ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে ছিল, যেখানে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
অর্থাৎ, আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়া বিদ্যমান সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি
বর্তমান পরিস্থিতিতে আদানি পাওয়ার ও সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর চাওয়া জরুরি—
গোড্ডা কেন্দ্রের বয়লার বা ফিড ইউনিটে ঠিক কী ধরনের ত্রুটি হয়েছে?
ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর কত সময়ের মধ্যে মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে?
একটি ইউনিট বন্ধ থাকলেও অন্য ইউনিটের উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে কি না?
আগস্ট থেকে কয়লা সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি কেন দীর্ঘস্থায়ী হলো?
বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিতে সরবরাহ ব্যাহত হলে আদানি পাওয়ারের নির্দিষ্ট দায় কী?
সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ কী ধরনের ক্ষতিপূরণ বা চুক্তিগত প্রতিকার পেতে পারে?
আদানির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সমস্যা সমাধানে কোনো বিকল্প বা সহযোগিতামূলক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কি না?
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এই সরবরাহ সংকট সম্পর্কে অবহিত কি না এবং তারা কোনো সমাধানে যুক্ত হয়েছে কি না?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কি না?
বিদ্যুৎ কোনো রাজনৈতিক অস্ত্র হওয়া উচিত নয়
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দিল্লি যাবেন কি না, সেটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত।
একইভাবে ভারত বা ভারতের কোনো কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চুক্তি রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নয়; বরং চুক্তির শর্ত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রীতি ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ আদানির বিদ্যুৎ বিনামূল্যে নেয় না। এই বিদ্যুতের জন্য অর্থ পরিশোধ করে বাংলাদেশ। ফলে এটি কোনো অনুদান নয়, বরং একটি বাণিজ্যিক চুক্তি। সুতরাং সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—চুক্তি অনুযায়ী তাদের অধিকার কোথায়?
তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়া এবং এর পরদিন আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা পরপর ঘটেছে—এটি তথ্য। কিন্তু একটি ঘটনার কারণে অন্যটি ঘটেছে—এমন দাবি এখনো প্রমাণিত নয়।
যদি এটি নিছক কারিগরি ত্রুটি হয়, তাহলে আদানি পাওয়ারকে দ্রুত স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করে বিস্তারিত প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা দিতে হবে। আর যদি কোনো রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক চাপের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্ন।
ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক প্রতিহিংসার নয়, পারস্পরিক স্বার্থের হওয়া উচিত। আর বিদ্যুৎ কোনোভাবেই রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়।
ডিআর




Comments