Image description

একটি সংবাদপত্র কেবল প্রতিদিনের কিছু সংবাদ পরিবেশনের কাগজ নয়, এটি কালির অক্ষরে ছাপা সমাজের হৃদস্পন্দন, ইতিহাসের অলিখিত নথি এবং সত্য প্রকাশের এক আপসহীন হাতিয়ার। ২০১২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ‘আমাদের ভাষা গণমানুষের’ প্রত্যয় ও অঙ্গীকার বুকে নিয়ে দৈনিক মানবকণ্ঠ তার যাত্রার শুভ সূচনা করেছিল। সময় গড়িয়ে আজ ১৫ সেপ্টেম্বর, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে মানবকণ্ঠ পরিবারের প্রতিটি সদস্য, অগণিত পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা এবং শুভানুধ্যায়ীদের জানাই আমার আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

এই বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে তাকালে অজস্র স্মৃতি, সংগ্রাম আর সফলতার ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একটি গণমাধ্যমকে গণমানুষের কথা তুলে ধরতে কত রকম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় তার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে এক দশক পার করার প্রতিটি মুহূর্ত আমাকে প্রতিনিয়ত নতুন বাস্তবতা শিখিয়েছে।

প্রতিষ্ঠার চার বছর পর, ২০১৬ সালের ৯ এপ্রিল আমি এই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব গ্রহণ করি। সেদিন যে পথচলা শুরু হয়েছিল, সময়ের নিয়মে আজ তা এক দশক পার করার কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা কেবল আমার পেশাগত জীবনের অংশ নয়, বরং এটি আমার চিন্তা, সত্তা ও অস্তিত্বের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে যাওয়া এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।

একটি জাতীয় দৈনিককে সাফল্যের শিখরে ধরে রাখা, টেকসই করা, গণমাধ্যমের নীতি-নৈতিকতা সমুন্নত রাখা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির যুগে পত্রিকাটিকে আধুনিকতার সাথে মানিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করা কখনোই সহজ ছিল না। তবে পরিচালনা পর্ষদের দিকনির্দেশনা, সময়ের পরিক্রমায় একঝাঁক অভিজ্ঞ ও কিছু তরুণ সহকর্মীর ক্লান্তিহীন শ্রম এবং পাঠকদের অকৃত্রিম আস্থার কারণে আমরা প্রতিটি বাধা অতিক্রম করতে পেরেছি। মানবকণ্ঠের মূল শক্তি এর বস্তুনিষ্ঠতা ও গণমানুষমুখী দৃষ্টিভঙ্গি। ক্ষমতার চাটুকারিতা কিংবা চটকদার অপসাংবাদিকতার ভিড়ে মানবকণ্ঠ সবসময় আলাদা পরিচয় বজায় রেখেছে।

গ্রামের অজপাড়াগাঁয়ের কৃষক, মেহনতি শ্রমিক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, তরুণ সমাজ থেকে শুরু করে নীতি-নির্ধারকী পর্যায়—সবার অবদমিত কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠাই ছিল আমাদের মূল ব্রত। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে সত্য তুলে আনা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার ক্ষেত্রে আমরা কখনোই আপস করিনি। নীতি ও আদর্শের এই জায়গায় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটাই মানবকণ্ঠকে পাঠকদের হৃদয়ে এক অনন্য আসনে বসিয়েছে।

বিগত বছরগুলোতে মিডিয়া জগতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যমে সংবাদের চাহিদায় বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটেছে। তবে আমরা এই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছি। মানবকণ্ঠ কেবল প্রিন্ট সংস্করণে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং অনলাইন পোর্টাল ও ডিজিটাল প্লাটফর্মে বস্তুনিষ্ঠ ও তাৎক্ষণিক খবর পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে আমরা আধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য সবসময় একটাই—সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা ও সততা বজায় রেখে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়া।

সংবাদের গুণগত মান, তথ্যের সততা এবং উপস্থাপনার নান্দনিকতা বজায় রেখে আধুনিক সাংবাদিকতার ধারায় মানবকণ্ঠ আজ এক অগ্রগামী নাম। এক দশকেরও বেশি সময়ের এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় দেশ ও জাতির বহু সংবেদনশীল মুহূর্তের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়েছে মানবকণ্ঠ। সামাজিক বিপর্যয়, অর্থনৈতিক উত্থান-পতন কিংবা রাজনৈতিক পট পরিবর্তন—প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে মানবকণ্ঠ পাঠকদের কাছে নিরপেক্ষ তথ্য পৌঁছাতে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। এই ঐতিহাসিক যাত্রার অংশ হওয়ার সুযোগ পাওয়া আমার জীবনের অন্যতম বড় অর্জন।

আমাদের প্রতিটি পৃষ্ঠায়, প্রতিটি লাইনে লুকিয়ে থাকে সাধারণ মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং রাষ্ট্রের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আনন্দঘন দিনে আমাদের নতুন করে শপথ নেওয়ার সময়। সময়ের সাথে এবং প্রযুক্তির সঙ্গে পরিবর্তন আনতে পারে, কিন্তু গণমাধ্যমের মূলকথা—সত্য, নিরপেক্ষতা, নৈতিকতা—অপরিবর্তিত।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আনন্দঘন দিনে আমাদের অঙ্গীকার একটাই—আমরা সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হব না। পাঠকের ভালোবাসাকে পাথেয় করে আমরা আরও বহুদূর এগিয়ে যেতে চাই। “আমাদের ভাষা গণমানুষের”—এই স্লোগানকে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে, প্রতিটি সংবাদে এবং প্রতিটি উদ্যোগে বাস্তবায়িত করাই হবে আমাদের প্রতিদিনের প্রয়াস। পাঠকের ভালোবাসাকে পাথেয় করে আমরা আগামী দিনে আরও সমৃদ্ধ, আরও আধুনিক এবং আরও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই। মানবকণ্ঠের অতীতের ন্যায় আগামী দিনের যাত্রাও সুগম ও উজ্জ্বল হোক। জয় হোক গণমানুষের, জয় হোক বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, মানবকণ্ঠ

 এনএ