বিশ্বের শান্তি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও উন্নয়নের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ বর্তমানে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর নির্ধারিত চাঁদা সময়মতো না পাওয়া, বিপুল বকেয়া এবং স্বেচ্ছা অনুদান কমে যাওয়ায় সংস্থাটিকে ব্যয় কমানো ও কাঠামোগত সংস্কারের পথে যেতে হচ্ছে।
জাতিসংঘের ‘ইউএন৮০ উদ্যোগ’-এর জুন ২০২৬-এর অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে জাতিসংঘ সচিবালয়ের নির্ধারিত চাঁদার বকেয়া ছিল ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ তা বেড়ে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ চার বছরে বকেয়া বেড়েছে প্রায় ৯৪ শতাংশ। এর মধ্যে নিয়মিত বাজেট ও শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অর্থও রয়েছে।
অর্থসংকটের প্রভাব পড়েছে জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেটেও। ২০২৬ সালের জন্য সাধারণ পরিষদ ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বাজেট অনুমোদন করেছে, যা ২০২৫ সালের অনুমোদিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ কম। ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের শুরুতে ২ হাজার ৯০০টি পদ বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে এক হাজারের বেশি কর্মীর চাকরি ছাড়ার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে।
জাতিসংঘ সচিবালয়ের ব্যবস্থাপনা, কৌশল, নীতি ও বিধি মেনে চলাবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা জুলাইয়ে এক ব্রিফিংয়ে জানান, সচিবালয়ের ব্যয় ৯ দশমিক ২ শতাংশ কমানো হয়েছে। তবে এই হারকে জাতিসংঘের সামগ্রিক নিয়মিত বাজেট কমার হার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ২০২৭ সালের বাজেটে একই মাত্রায় আরেক দফা কাটছাঁটের পরিকল্পনাও নেই বলে জানান তিনি।
জাতিসংঘের আর্থিক সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর নির্ধারিত চাঁদা যথাসময়ে পরিশোধ না করাকে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বেচ্ছা অনুদানের প্রবাহ কমে যাওয়া এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অর্থসংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সংকট মোকাবিলায় গত জুনে সাধারণ পরিষদ একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ৯০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি এবং নিয়মিত বাজেটের প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছে ফেরত দেওয়ার চাপ থেকে মুক্ত থাকবে। তবে তৎকালীন সাধারণ পরিষদ সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক বলেছিলেন, এ সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের আর্থিক সমস্যার মূল কারণ দূর করবে না। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সময়মতো ও পূর্ণাঙ্গ অর্থ প্রদান প্রয়োজন।
এমন পরিস্থিতিতেই ৯ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। বাংলাদেশের খলিলুর রহমান এই অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের উপযোগী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বছরের মূল প্রতিপাদ্য—‘আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ’।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, খলিলুর রহমানের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু, মানবাধিকার ও মানবিক সহায়তা, ডিজিটাল শাসন এবং জাতিসংঘ সংস্কার। ফলে আর্থিক সংকটের মধ্যে এসব অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন এবং সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া তাঁর সভাপতিত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
‘ইউএন৮০ উদ্যোগ’-এর আওতায় প্রশাসনিক ব্যয় কমানো, কাজের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা, দক্ষতা বাড়ানো এবং সীমিত সম্পদের অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরের কাজ ও কাঠামো পর্যালোচনাও চলছে। তবে কর্মীসংখ্যা কমানো ও ব্যয় সংকোচনের ফলে বিভিন্ন কার্যক্রমে কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
চাঁদা আদায়ের ক্ষেত্রে অবশ্য কিছু অগ্রগতি হয়েছে। জাতিসংঘের চাঁদা নির্ধারণবিষয়ক কমিটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ১৪০টি ২০২৬ সালের নিয়মিত বাজেটের নির্ধারিত চাঁদা পুরোপুরি পরিশোধ করেছে। এখনো ৫৩টি দেশ তাদের নির্ধারিত চাঁদা পুরোপুরি পরিশোধ করেনি।
সব মিলিয়ে অর্থসংকট, সংস্কারের চাপ এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আস্থার প্রশ্ন—তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলছে। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ায় খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে নেওয়া উদ্যোগগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
এসএস




Comments