ঘরের দরজা খুললেই হয়তো ছেলে ফিরে আসবে—এই আশায় প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন সূর্যবান বেগম। দুই মাস ধরে নিখোঁজ ছেলে সাইদুল বেপারীর (৩২) অপেক্ষায় দিন কাটছে তাঁর। ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়া সাইদুল এখন লিবিয়ায় নিখোঁজ। ছেলের কোনো সন্ধান না পেয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে পরিবারের।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের ঘটকচর দত্তের হাট এলাকায় গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। সাইদুলের মা সূর্যবান বেগম বলেন, ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে জমিজমা বিক্রি, ধারদেনা ও সুদের টাকা মিলিয়ে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুই মাস ধরে ছেলের কোনো সন্ধান নেই। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, এই বুঝি আমার ছেলে এসে ডাকবে। আমি আমার ছেলেকে ফিরে পেতে চাই।’
সাইদুলের স্ত্রী মেরি আক্তারও দুই সন্তান নিয়ে স্বামীর অপেক্ষায় রয়েছেন। চার বছরের মেয়ে প্রতিদিন বাবার সঙ্গে কথা বলতে চায়। মেরি বলেন, ‘মেয়েটা প্রতিদিন আব্বুর সঙ্গে কথা বলতে চায়। কিন্তু আব্বু তো ফোনের ওপাশে নেই। সন্তানদের কীভাবে মানুষ করব, বুঝতে পারছি না।’
স্বজন জলিল বেপারীসহ স্থানীয়রা জানান, সাইদুল নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। অনেক সময় স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের খাবার জোটে। তারা সাইদুলের সন্ধান ও ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবি করেন।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটকচর এলাকার মৃত বাদশা ফরাজির ছেলে আনোয়ার ফরাজী ২৩ লাখ টাকার চুক্তিতে সাইদুলকে ইতালি পাঠানোর কথা বলেন। ২০২৫ সালের ৬ মে অগ্রিম ১২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে ৯ জুন শ্রীলঙ্কা ও দুবাই হয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে নেওয়া হলেও তাঁকে লিবিয়ায় পাঠানো হয় বলে পরিবারের দাবি।
স্বজনদের অভিযোগ, লিবিয়ায় নেওয়ার পর একটি চক্রের কাছে সাইদুলকে জিম্মি করা হয়। নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে পরিবারের কাছ থেকে ধাপে ধাপে আরও টাকা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা দেওয়ার পরও গত দুই মাস ধরে সাইদুলের সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই।
এ ঘটনায় গত ১১ সেপ্টেম্বর সাইদুলের বড় ভাই সামাদ হোসেন বাদী হয়ে আনোয়ার ফরাজী, শিল্পী আক্তার, বাদল জমাদ্দার, সাহেব আলী জমাদ্দার, মামুন বেপারী, ইভা বেগম ও ছলে বেগমসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনাল, মাদারীপুরে মামলা করেন।
তবে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু বলেন, ‘আমি তাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নেইনি।’ তাঁর স্ত্রী শিল্পী আক্তার বলেন, ‘তাদের কাছ থেকে ১৯ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।’
মাদারীপুর সদর থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, সাইদুল নিখোঁজের ঘটনায় পরিবার আদালতে মামলা করেছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। আদালতের নির্দেশনা থানায় পৌঁছালে বিষয়টি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসএ




Comments