পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে
শয্যার চারগুণ রোগী, জনবল এক-তৃতীয়াংশ
পটুয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর চাপ। জেলার আট উপজেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী আমতলী, তালতলী ও বেতাগীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন এই হাসপাতালে। ২৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ৯০০ থেকে ৯৫০ জন রোগী ভর্তি থাকায় ধারণক্ষমতার তিন থেকে চারগুণ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। ফলে শয্যার সংকটে অনেক রোগীকে বারান্দা ও মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গতকাল হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৮৪২ জন। এর মধ্যে ৩০ শয্যার মেডিসিন ওয়ার্ডেই ভর্তি ছিলেন নির্ধারিত শয্যার কয়েকগুণ রোগী। ডেঙ্গু ও শিশু ওয়ার্ডেও শয্যার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি রয়েছেন। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে অধিকাংশ ওয়ার্ডেই শয্যার পাশাপাশি বারান্দা ও মেঝেতে রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ বাড়লেও সে অনুযায়ী বাড়েনি জনবল। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকের অনুমোদিত ৭৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৭ জন। অর্থাৎ ৫০টি পদই শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে জুনিয়র কনসালটেন্টের ১১টি পদের মধ্যে আটটিই শূন্য। সিনিয়র কনসালটেন্ট, সার্জারি, শিশু, মেডিসিন, ইএনটি, অ্যানেস্থেশিয়া, চক্ষু, চর্ম ও যৌন, কার্ডিওলজি ও অর্থোপেডিক বিভাগেও চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে।
এ ছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ১৬৬টি পদের মধ্যে ৭৩টি শূন্য। ফলে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি হাসপাতালের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় কর্মরতদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী নয়ন বলেন, “আমাদের মেডিকেলে যে পরিমাণ জনবল দরকার, সেই পরিমাণ জনবল নেই। এ কারণে আমাদের খুবই কষ্ট হয়। নিয়মিত ডিউটির পাশাপাশি অতিরিক্ত কাজ করতে হচ্ছে।”
মেডিসিন বিভাগের নার্সিং ইনচার্জ ইশরাত জাহান বলেন, “রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। ওয়ার্ডে রোগী রাখার জায়গা নেই। আমাদের নার্সেরও সংকট রয়েছে। ফলে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
জনবল সংকটের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি ও থাকা যন্ত্রপাতি অচল থাকায় আরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে রোগীদের। হাসপাতালের দুটি এক্স-রে মেশিনের একটি অচল। দুটি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনের একটি অচল রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০টি এক্স-রে করতে হয়। একটি মেশিন অচল থাকায় রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. তামান্না আক্তার বলেন, “হাসপাতালের বেশ কিছু পদ শূন্য থাকায় কাজ করতে অসুবিধা হচ্ছে। রোগীর চাপ এত বেশি যে, অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও আমাদের ডিউটি করতে হচ্ছে। শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেও হাসপাতালে আসতে হচ্ছে। এতে আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে।”
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. লিজা বলেন, “হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৯০০ থেকে ৯৫০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে ধারণক্ষমতার তিন থেকে চারগুণ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে আমাদের নানা ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একই সঙ্গে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদেরও চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “২৫০ শয্যার হাসপাতালের জন্য অনুমোদিত চিকিৎসক পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি থাকায় রোগীদের মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দিতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য আমরা প্রতি মাসেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠাচ্ছি।”
পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. খালেদুর রহমান টেলিফোনে বলেন, “প্রতিদিন ৯০০ থেকে ৯৫০ জন রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে মাত্র ২৫ জন চিকিৎসক রয়েছেন। এতে চিকিৎসক ও রোগী—উভয় পক্ষকেই চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত অমানবিক। এ সমস্যা সমাধানে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি। এখন দেখি, কী করা যায়।”
এসএ




Comments