Image description

ভারী বৃষ্টি, সরু গলি, পূজা কমিটির আকস্মিক পরিবর্তন, আয়োজকদের চরম গাফিলতি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুপস্থিতি—সব মিলিয়ে কলকাতার দুর্গাপূজার মণ্ডপে ঘটা এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ১৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। 

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার অমর বোস সরণির চোরবাগান সার্বজনীন দুর্গাপূজার মণ্ডপে এই বিপর্যয় ঘটে।

রোববার সকালে কলকাতার অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের দেখতে যান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্যপাল আর এন রবি, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যসহ রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।

দুর্ঘটনার পর পরই এর দায় কার—তা নিয়ে রাজ্যজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজে চোরবাগান ক্লাবের একটি পোস্টার প্রকাশ করা হয়, যেখানে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাইপো দেবদ্বীপ অধিকারীর নাম রয়েছে। এছাড়া পূজা কমিটির চেয়ারম্যান পদে এক বিজেপি বিধায়ক রয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এই প্রাণহানির দায় কে নেবে?

ঘটনার তদন্তে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ইতোমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে। রোববার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও অতিরিক্ত জমায়েত এড়াতে ওই মণ্ডপ ও আশপাশের এলাকায় ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিমা দর্শন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

এ ঘটনায় পূজা কমিটির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও সদস্যসহ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার তাদের কলকাতার নগর দায়রা আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাদের ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন।

রোববার ভবানী ভবনে রাজ্য পুলিশের সদর দপ্তরে পুলিশ কমিশনার ও এসপিদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী জানান, চোরবাগান মণ্ডপের আয়োজন ও থিমে বড় ধরনের ত্রুটি ছিল এবং পুলিশের গাফিলতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি আরও ঘোষণা করেন, “এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী পূজার প্রস্তুতি নেওয়া হবে। কলকাতার পাশাপাশি গোটা জেলায় যেখানেই দর্শনার্থীদের অতিরিক্ত জমায়েত হবে, তার জন্য পৃথক ও কঠোর নির্দেশিকা তৈরি করা হবে। সেখানে কোনো ভিআইপি বা বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে না, সকলেই সমান।” কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারপ্রতি আর্থিক ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, পুরোনো কমিটির তত্ত্বাবধানে খুঁটিপূজার মধ্য দিয়ে পূজা শুরু হলেও পরবর্তীতে কমিটি পরিবর্তন করে নতুনদের হাতে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা হিন্দু শাস্ত্রের পরিপন্থী। এছাড়া নতুন কমিটির প্রধান স্থানীয় বাসিন্দা নন বলেও অভিযোগ ওঠে।

নিহতদের মধ্যে ১৩ বছরের নবম শ্রেণির ছাত্র প্রাঞ্জল রাউত এবং হাওড়ার লিলুয়ার আকৃতি রাউতের মতো তরুণ প্রাণ ঝরে পড়ায় গোটা এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এত বড় প্রাণহানির পরও সপ্তমীর রাতে অনেক মণ্ডপে মানুষের ভিড় দেখা গেছে এবং অনেকেই দূর থেকে চোরবাগানের মণ্ডপ পরিদর্শন করে ফিরে গেছেন।

ডিআর