Image description

ঠিকাদারের প্রায় ২১২ কোটি টাকার বকেয়া বিল পরিশোধ না করা এবং মূল প্রকল্প থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাজ বাদ দেওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়েছে জামালপুরের ১০০ মেগাওয়াট মাদারগঞ্জ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। ঠিকাদারের দাবি, বকেয়া না পাওয়ায় কাজের অগ্রগতি থমকে গেছে।

অন্যদিকে, প্রকল্পের পরিধি থেকে বড় অঙ্কের কাজ বাদ দেওয়া হলেও অবশিষ্ট কাজ কীভাবে সম্পন্ন হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা।

১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। এরপর ১ অক্টোবর বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নূর আহমেদ ও উপসচিব আহসান সাদী প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত কাজ শুরুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমারা রাজা ইনফ্রা প্রাইভেট লিমিটেডের (এআরআইপিএল) সহকারী ব্যবস্থাপক শাহিনুর ইসলাম বলেন, বাস্তবায়নকারী সংস্থা রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের প্রায় ২১২ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করছে না। এতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট বেড়েছে এবং প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

এআরআইপিএলের অভিযোগ, প্রকল্পের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর সুইজারল্যান্ডভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এএফআরওয়াই (AFRY) ও ঠিকাদারকে সম্পৃক্ত না করেই প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাজ প্রকল্পের পরিধি থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে উপপ্রকল্প পরিচালক হুমায়ুন আখতারের স্বাক্ষরিত নথিতে এ-সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। কাজ বাদ দেওয়ার পর বাকি অংশ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় প্রকল্পের কারিগরি কাঠামো ও কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত SVG (Static VAR Generator), MMS Foundation, Module Cleaning System, বিভিন্ন ইলেকট্রিক্যাল ও ব্যালান্স অব প্ল্যান্ট সরঞ্জাম এবং অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স (O&M) সংশ্লিষ্ট নানা কার্যক্রম বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি কর্মক্ষমতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং উৎপাদন দক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অভিযোগ রয়েছে, এসব পরিবর্তনের ফলে মূল অনুমোদিত প্রকল্প কাঠামো ও কার্যকরী সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক ফেরদৌস রহমান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া হ্রাসকৃত ও সংশোধিত BOQ (Bill of Quantities) মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে RDPP-তে একাধিক উপাদান বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে মূল প্রকল্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বাদ পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী রস্তুম আলী বলেন, বাদ পড়ার তালিকায় রয়েছে স্ট্যাটিক ভিএআর জেনারেটর (এসভিজি), মডিউল পরিষ্কারের ব্যবস্থা, বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ-সংশ্লিষ্ট কাজ। এগুলো বাদ পড়লে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি কর্মক্ষমতা ও উৎপাদন দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

প্রকল্পের নকশা অনুমোদনেও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। এমএমএস পাইলিং ড্রয়িং প্রথমে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে অনুমোদন পেলেও পরে তা পরিবর্তনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। চূড়ান্ত অনুমোদন মেলে ২৬ জুন ২০২৫ তারিখে। এ ছাড়া জমি হস্তান্তরের পর প্রায় ১০ একর জমি কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায় এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয় মূল ভূমি হস্তান্তরের প্রায় ৫২৪ দিন পর। প্রকল্প এলাকায় এখনো কয়েকটি পরিবার বসবাস করছে বলে সূত্রের দাবি।

এদিকে ৫০ মেগাওয়াটের সৌর মডিউল ১৮ জুলাই ২০২৫ তারিখে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছালেও আরপিসিএল পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশন (পিএলআই) সম্পন্ন করেনি বলে অভিযোগ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। এতে প্রায় ২৫ কোটি টাকার অতিরিক্ত বিল উত্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

প্রকল্পের পরিস্থিতি পর্যালোচনায় আরপিসিএলের একটি বোর্ড কমিটি গত ১৬ অক্টোবর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে।

পরিদর্শনকালে বোর্ড সদস্য শাহিদুল ইসলামের কাছে ডিস্কোপিং, ঘন ঘন নকশা পরিবর্তন, পিএলআই সম্পন্ন না হওয়া, দীর্ঘদিন অর্থ পরিশোধ না করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণ জানতে চান সাংবাদিকরা। তবে তিনি এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে এড়িয়ে যান।

বর্তমান প্রকল্প পরিচালক জাহাঙ্গীর মজুমদারের কাছে বকেয়া বিল, কাজ বাদ দেওয়া ও প্রকল্পের বিলম্ব নিয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বকেয়া বিল পরিশোধ, বাদ দেওয়া কাজের বিষয়ে স্বচ্ছ কারিগরি মূল্যায়ন এবং অবশিষ্ট কাজ বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নিশ্চিত না হলে ১০০ মেগাওয়াটের এ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

ডিআর