যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইসলামবিদ্বেষ ও মুসলিমবিরোধী বক্তব্য। বিশেষ করে মুসলিম প্রার্থীদের লক্ষ্য করে রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণায় বিদ্বেষের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে এর প্রভাব শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই; সন্তানদের ভবিষ্যৎ, সামাজিক জীবন ও নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন দেশটির মুসলিম পরিবারগুলো।
মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের মতো নেতারা মুসলিমবিরোধী প্রচারণার লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। টেক্সাসেও কয়েক বছর ধরে মুসলিমদের লক্ষ্য করে রাজনৈতিক বক্তব্য ও নীতিনির্ধারণী তৎপরতা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন সেখানকার মুসলিম ভোটাররা।
এবার টেক্সাসে রাজ্যজুড়ে কোনো মুসলিম প্রার্থী নির্বাচনে না থাকলেও মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে মধ্যবর্তী নির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, রাজনীতিতে মুসলিমদের নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণার প্রভাব পড়ছে পরিবার, সন্তান এবং দৈনন্দিন সামাজিক জীবনে।
নির্বাচনের কয়েক দিন আগে হিউস্টনের একটি ইসলামিক সেন্টারে পরিবারের সঙ্গে ‘ফল ফেস্ট’ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন ৪৫ বছর বয়সী আইনজীবী সামির নাজজাম। তিনি বলেন, রাজনীতিতে মুসলিমবিদ্বেষের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন নিজের সন্তানদের মাধ্যমে। তাঁর ভাষ্য, প্রাপ্তবয়স্করা নিজেদের পছন্দমতো মানুষের সঙ্গে মিশতে পারলেও শিশুরা একই স্কুলে পড়ে। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে পাওয়া রাজনৈতিক ও সামাজিক ধারণার কারণে শিশুরাও একে অপরকে অপ্রীতিকর কথা বলে।
টেক্সাসের মোট জনসংখ্যার দুই শতাংশেরও কম মুসলিম। তবে এবার ভোটার উপস্থিতি বাড়িয়ে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের শক্তি দেখাতে চান সম্প্রদায়টির সংগঠকেরা। দল-মতনির্বিশেষে মুসলিম ভোটারদের অনেকে আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক নেতাদের কাছে তারা একটি বার্তা দিতে চান—কোনো দলের স্বার্থে মুসলিমদের যেন ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা না হয়।
হিউস্টনের ৩০টির বেশি মসজিদের তত্ত্বাবধানকারী ইসলামিক সোসাইটি অব গ্রেটার হিউস্টনের সভাপতি এমরান গাজী বলেন, মুসলিমরা বিভিন্ন জায়গায় কোণঠাসা হচ্ছেন এবং বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সংগঠনটি এবার ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম বাড়িয়েছে। এমনকি জুমার নামাজের সময়ও ধর্মীয় নেতারা মুসল্লিদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সমর্থন করছে না সংগঠনটি।
শরিয়াহ আইন নিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণা
টেক্সাসের মুসলিম ভোটারদের অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থে মুসলিম সম্প্রদায়কে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেখানোর প্রবণতা বেড়েছে। রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত এই অঙ্গরাজ্যে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও নীতিগত পদক্ষেপ তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
৪২ বছর বয়সী চিকিৎসক মারিয়াম আহমেদ বলেন, পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। গত দুই বছরে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাও ভেবেছেন। তাঁর আশঙ্কা, সন্তানকে যেন সন্ত্রাসী হিসেবে দেখা না হয়।
টেক্সাসের রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট এবং রাজ্য রিপাবলিকান পার্টির বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে ‘শরিয়াহ আইন’ প্রসঙ্গ। মুসলিমদের অভিযোগ, ইসলামের ধর্মীয় রীতিনীতি ও বিধিবিধানকে টেক্সাসের মানুষের জন্য আসন্ন হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
গত মাসে ডালাসে অনুষ্ঠিত রিপাবলিকান মিডটার্ম কনভেনশনে গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট বলেন, ওয়াশিংটনের জন্য অপেক্ষা না করে টেক্সাসে শরিয়াহ আইন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হবে। একই অনুষ্ঠানে রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজও শরিয়াহ আইনকে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেন।
গত জুনে টেক্সাসের রিপাবলিকান পার্টি ‘ডোন্ট শরিয়াহ মাই টেক্সাস’ শিরোনামে একটি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করে। এতে শরিয়াহ আইনের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি শাস্তি, সরকারি চাকরি ও সামরিক বাহিনীতে কাজের অযোগ্য ঘোষণা, নাগরিকত্ব বাতিল এবং দেশ থেকে বহিষ্কারের মতো পদক্ষেপের কথা বলা হয়।
এর আগে মার্চে টেক্সাসের আইনপ্রণেতারা ‘শরিয়াহ-ফ্রি টেক্সাস ককাস’ নামে একটি জোট গঠন করেন। ১৫০ সদস্যের রাজ্য আইনসভায় এ জোটে ৩৮ জন সদস্য যুক্ত হয়েছেন। এ ছাড়া টেক্সাসের দুই রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য চিপ রয় ও কিথ সেলফ ‘শরিয়াহ-ফ্রি আমেরিকা ককাস’ নামে আরেকটি জোট গঠন করেন। কংগ্রেসে এ জোটের সদস্যসংখ্যা ৬৮।
যুক্তরাষ্ট্রে চালু নেই শরিয়াহ আইন
মানবাধিকারকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শরিয়াহ আইন নিয়ে রাজনীতিবিদদের প্রচারণা উদ্বেগজনক। কারণ টেক্সাস কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোনো অঙ্গরাজ্যে ইসলামি আইন চালুর নজির নেই।
হিউস্টনে বসবাস শুরু করা ৩৩ বছর বয়সী চিকিৎসক সারাহ দাব্বাস বলেন, বাস্তব জীবনে মানুষকে যেভাবে বিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তারা সবাই তেমন নন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো মুসলিম সরকারে ইসলামি আইন চাপিয়ে দেননি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইসলামবিদ্বেষ পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংগঠনের দাবি, টেক্সাসের রাজনীতিবিদরা কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বড় করে দেখাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর টেক্সাসে মুসলিমদের জন্য বিশেষ আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং স্বেচ্ছায় ইসলামি সালিশ পরিচালনাকারী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম। খ্রিষ্টান ও ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যেও এ ধরনের স্বেচ্ছামূলক সালিশব্যবস্থা রয়েছে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ইসলামবিদ্বেষ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘দ্য ব্রিজ ইনিশিয়েটিভ’ বলেছে, টেক্সাসের রাজনীতিবিদরা মুসলিমদের সাধারণ নাগরিক কর্মকাণ্ডকেও ইসলামি আইন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মুসলিমদের জনজীবনে অংশগ্রহণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততাকেও ইসলামি আইনের বিস্তারের হুমকি হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
রেহাই পাচ্ছেন না রিপাবলিকান মুসলিমরাও
টেক্সাসের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শুধু ডেমোক্র্যাট বা সাধারণ মুসলিমরাই নন, রিপাবলিকান পার্টির সঙ্গে যুক্ত মুসলিমরাও বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত জুনে টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনে এক ঘটনায় দলটির বিদায়ী চেয়ারম্যান আব্রাহাম জর্জ দুই মুসলিম প্রতিনিধিকে দল ছেড়ে চলে যেতে বলেন বলে টেক্সাস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য এক ঘটনায় রাজ্যের এক সিনেটর আলোচনাসভায় দাবি করেন, শরিয়াহ আইন অনুযায়ী মুসলিমদের নিজেদের পরিচয় আড়াল করতে মিথ্যা বলতে হয়।
হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন দলীয় প্রতিনিধি তারেক হোসেনের ছেলেও। তারেক হোসেন ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের (কেয়ার) হিউস্টন কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোজোসার চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা গভর্নর অ্যাবট কেয়ার টেক্সাসকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার এ ধরনের তকমা দিয়ে থাকে। এ ছাড়া ডেমোক্র্যাট জেমস টালারিকোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট নির্বাচনে থাকা টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন কেয়ারের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। রাজ্যটিতে সংগঠনটির কার্যক্রম বন্ধ করতে আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তিনি।
এর জবাবে কেয়ার টেক্সাসের গভর্নর অ্যাবটের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। সংগঠনটির অভিযোগ, অ্যাবটের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানপ্রদত্ত বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের পরিপন্থি।
ভোটের মাধ্যমেই পরিবর্তনের আশা
স্থানীয় সংগঠকদের মতে, মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ থাকলেও সেই অসন্তোষকে রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া সহজ হচ্ছে না। হিউস্টনসহ টেক্সাসের মুসলিম সম্প্রদায় জাতিগত ও ভাষাগত দিক থেকে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় বলে জানিয়েছেন কোয়ালিশন ফর পিস, রিলিফ অ্যান্ড ইকুইটিতে কাজ করা সানিয়া রহিম।
তাঁর মতে, শুধু আরবি ভাষায় ভোট দেওয়ার প্রচারণা চালালে হবে না, কারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ আরবি ভাষায় কথা বলেন না। টেক্সাসের মুসলিম ভোটাররা সাধারণত রাজ্যজুড়ে নির্বাচনের চেয়ে স্থানীয় নির্বাচনে বেশি সক্রিয় থাকেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সম্প্রতি টেক্সাসের শিক্ষা বোর্ডের একটি সিদ্ধান্তও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। বোর্ড উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের যে পাঠ্যক্রম অনুমোদন করেছে, তাতে ‘চরমপন্থি ইসলাম’ ধারণাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ।
হিউস্টনের ইসলামিক সেন্টারে আয়োজিত ‘ফল ফেস্ট’ অনুষ্ঠানে কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের (কেয়ার) অ্যাকশনের সরকারি সম্পর্ক ও আইনবিষয়ক ব্যবস্থাপক সামিহা রিজভি বলেন, মুসলিমদের একটি অংশের মধ্যে বৈষম্য ও বিদ্বেষ মোকাবিলায় নীরব থাকার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তবে তাঁর মতে, পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য ভোট দেওয়া জরুরি।
তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যক্তিদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, পরিবারগুলোর জন্য অঙ্গরাজ্যকে নিরাপদ করে তুলতে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। মুসলিম সংগঠকদের প্রত্যাশা, ভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারবেন তারা।
সূত্র: আল জাজিরা
এনএ




Comments