Image description

সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনামলের অন্যতম প্রভাবশালী গোয়েন্দা কর্মকর্তা হুসাম লুকার সন্ধান মিলেছে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে। একটি পুরোনো ফোনবুকের সূত্র ধরে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তার অবস্থান শনাক্ত করেছে বিবিসি।

হুসাম লুকা সিরিয়ার শক্তিশালী বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জেনারেল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেটের (জিএসডি) প্রধান ছিলেন। আসাদ সরকারের হয়ে নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের কারণে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের পর অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তার মতো লুকাও হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যান। এরপর থেকেই তার অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। তার বিরুদ্ধে আসাদ সরকারের আমলের অপরাধের জন্য বিচারের দাবিও ওঠে।

পরিত্যক্ত অ্যাপার্টমেন্টে পাওয়া ফোনবুক

আসাদ সরকারের পতনের কয়েক দিন পর দামেস্কে লুকার পরিত্যক্ত বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালিয়ে একটি নোটবুক পাওয়া যায়। এতে নীল কালিতে লেখা ছিল বহু মানুষের নাম ও ফোন নম্বর। তালিকায় দোকানদার, চিকিৎসক, সামরিক কর্মকর্তা এবং লুকার পরিবারের সদস্যদের নামও ছিল।

বিবিসি ওই নোটবুকের ১৫৫টি নম্বরের ছবি সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ৫১টি নম্বর সচল পাওয়া যায়। এরপর লুকার ঘনিষ্ঠ বলে মনে হওয়া সামরিক কর্মকর্তা, আত্মীয়স্বজনসহ বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।

পরবর্তীতে বিবিসির এক সাংবাদিক সিরিয়ায় গিয়ে ফোনবুকে থাকা কয়েকজনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন চিকিৎসক ছিলেন। একজন চিকিৎসক স্বীকার করেন, তিনি লুকার চিকিৎসা করেছিলেন। আরেকজন জানান, একসময় লুকার মায়ের সঙ্গে চিকিৎসার জন্য রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। তবে কেউই লুকার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি।

দেহরক্ষীর কাছ থেকে মেলে নতুন সূত্র

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ফোনবুকে থাকা এক ব্যক্তি বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন। তিনি লুকার অ্যাপার্টমেন্টের নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন। তার কাছ থেকেই লুকার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তির ফোন নম্বর পাওয়া যায়।

‘মাহমুদ’ নামে পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতন যখন প্রায় নিশ্চিত, তখন লুকা তাকে বলেছিলেন যে তিনি দামেস্ক রক্ষার জন্য থেকে যাবেন। কিন্তু পরদিন ভোরেই তিনি অদৃশ্য হয়ে যান। যাওয়ার সময় অফিসের সিন্দুক থেকে বিপুল অর্থ নিয়ে গিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন মাহমুদ।

পরে লুকার গাড়িচালকের একটি নম্বরও পাওয়া যায়। সেই সূত্র ধরে তার সম্ভাব্য পালানোর পথ অনুসন্ধান করতে গিয়ে লেবাননের দিকেও নজর দেয় বিবিসি।

লেবানন হয়ে রাশিয়ায় পালানোর দাবি

লেবানন সরকারের এক জ্যেষ্ঠ সূত্রের বরাতে বিবিসি জানায়, লুকা ভিন্ন নামে একটি রুশ পাসপোর্ট ব্যবহার করে লেবানন হয়ে রাশিয়ায় যান।

এরপর লুকার ফোনবুকে থাকা লেবাননে অবস্থানরত এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে বিবিসি। ওই ব্যক্তি লুকার একটি ফোন নম্বর দেন, যার কান্ট্রি কোড ছিল রাশিয়ার।

দামেস্কে লুকার অ্যাপার্টমেন্টেও রাশিয়ার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেখানে রাশিয়ার বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া একটি পুরস্কার এবং রাশিয়ার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার পাঠানো নববর্ষের শুভেচ্ছা কার্ড পাওয়া গিয়েছিল।

ফোনে লুকার সঙ্গে কথা বিবিসির

রাশিয়ার নম্বরটি হুসাম লুকারই কি না, তা যাচাই করতে বিবিসির এক সূত্র তাকে ফোনে যুক্ত করেন। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি এমন কিছু প্রশ্নের তাৎক্ষণিক ও সঠিক উত্তর দেন, যেগুলোর উত্তর লুকারই জানার কথা।

পরে বিবিসি সরাসরি তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পায়। তার পরিচয় নিশ্চিত করে নির্যাতন ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে লুকা বলেন, তার বর্তমান অবস্থান থেকে ফোনে কথা বলা ঝুঁকিপূর্ণ।

রাশিয়া তাকে কথা বলতে বাধা দিচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি কথা বলতে পারবেন না এবং বিষয়টি ব্যাখ্যাও করতে পারবেন না। রাশিয়ার বাইরে দেখা করার প্রস্তাবও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর ফোন কেটে দেন।

পরে লুকার নামে ব্যবহৃত আরেকটি নম্বর পায় বিবিসি। ওই নম্বরের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে মস্কোর উপকণ্ঠের দুটি এলাকায় তার অবস্থান শনাক্ত করা হয়।

বিচারের অপেক্ষায় ভুক্তভোগীরা

সিরিয়ায় লুকার বিরুদ্ধে বিচারের দাবি রয়েছে। দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল হাসান আল-তুরবা বিবিসিকে জানিয়েছেন, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন এবং নির্যাতনের কারণে মৃত্যুর অভিযোগে লুকার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

২০১১ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুরুর সময় হোমসে পলিটিক্যাল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেটের স্থানীয় প্রধান ছিলেন লুকা। ওই সময় বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সরকারি অবরোধের কারণে খাদ্য ও ওষুধের সংকট তৈরি হয়েছিল।

পরবর্তীতে তিনি জেনারেল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেটের প্রধান হন। তার অধীনস্থ বাহিনীর বিরুদ্ধে বিরোধী যোদ্ধা, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও মানবাধিকারকর্মীসহ সরকারের বিরোধী বলে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। অনেক বন্দিকে সেদনায়া কারাগারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কারাগারে পাঠানো হয়েছিল এবং তাদের অনেকের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

লুকার সন্ধান পাওয়ার খবর সিরিয়ায় বিচারপ্রত্যাশীদের মধ্যে আশার সৃষ্টি করলেও তাকে রাশিয়া থেকে ফেরানো কঠিন হতে পারে। আসাদ সরকারের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল রাশিয়া। বিবিসি জানিয়েছে, লুকার অবস্থান ও তাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে রুশ সরকারের কাছে জানতে চাওয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।