Image description

ফ্রান্স থেকে ভারত—বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈষম্য, দুর্বল জনসেবা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতিবাদে রাস্তায় নামছেন তরুণেরা। এসব আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকায় বিক্ষোভগুলোকে বলা হচ্ছে ‘জেন-জি আন্দোলন’। প্রায় ১৩ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এ ক্ষোভের প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক ও প্রজন্মগত বৈষম্য।

আল জাজিরায় ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক অস্কার বার্গলুন্ড লিখেছেন, ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর ইউরোপে আয় ও সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে। একই সময়ে সরকারি ব্যয় সংকোচনের কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ধনী ব্যক্তিরা উন্নত সেবা নিতে পারলেও সাধারণ মানুষের জন্য তা কঠিন হয়ে উঠছে।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে হতাশা

ফ্রান্সে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা ও অর্থসংকটের প্রতিবাদে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলছে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে পাঁচ লাখ থেকে আট লাখ মানুষ এসব বিক্ষোভে অংশ নেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

তরুণদের হতাশার আরেকটি কারণ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ায় বিশেষ করে নতুনদের জন্য নির্ধারিত কিছু চাকরির কাজ এখন যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সরকারের ধীরগতিও সমালোচনার মুখে পড়েছে।

আবাসনসংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ

তরুণদের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে। আগের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমানে তরুণদের আয়ের বড় অংশ বাড়িভাড়ায় ব্যয় হচ্ছে। স্পেনেও আবাসনসংকট ও উচ্ছেদবিরোধী আইন নিয়ে অসন্তোষ থেকে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। নিবন্ধটির লেখকের মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জলবায়ু সংকটের বড় ধরনের পরিণতি মোকাবিলা করতে হবে। অথচ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি থাকায় এই সংকটের ভার ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর পড়ছে।

বিক্ষোভ দমনে কঠোর হচ্ছে সরকার

নিবন্ধে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারগুলোর প্রধান প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠেছে দমন-পীড়ন। বিক্ষোভবিরোধী আইন, গ্রেপ্তার ও পুলিশের বলপ্রয়োগের ঘটনা বাড়ছে। তবে কোথাও কোথাও এসব পদক্ষেপ আন্দোলন থামানোর বদলে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ভারতে নির্বাচনি তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভের মধ্যে ‘ককরোচ’ আন্দোলনের নেতাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টিও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

সমাধান কোথায়?

অস্কার বার্গলুন্ডের মতে, তরুণদের ক্ষোভ কমাতে বৈষম্য ও সুশাসনের ঘাটতি দূর করার উদ্যোগ প্রয়োজন। মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী আবাসন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

তাঁর বিশ্লেষণে, তরুণদের বিক্ষোভ কেবল তাৎক্ষণিক ক্ষোভের প্রকাশ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রতিফলন। এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান না হলে বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।

লেখক পরিচিতি

অস্কার বার্গলুন্ড (Oscar Berglund) যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল ফর পলিসি স্টাডিজের আন্তর্জাতিক জননীতি ও সামাজিক নীতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ প্রভাষক। তিনি জলবায়ু আন্দোলন, নাগরিক অবাধ্যতা, সামাজিক আন্দোলন এবং প্রতিবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি নীতি ও রাজনীতি বিষয়ক গবেষণা সাময়িকী Policy & Politics-এর সহসম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

আল জাজিরায় প্রকাশিত মূল নিবন্ধটি সংক্ষেপিত ও অনুবাদ করেছেন দৈনিক মানবকণ্ঠের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক নুর আলম সিদ্দিকী।

প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত সংশ্লিষ্ট লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর যথার্থতা ও মতামতের দায় লেখক ও মূল উৎসের। এ বিষয়ে দৈনিক মানবকণ্ঠ কর্তৃপক্ষের অবস্থান সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ।