রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) রাকসু (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) এবং দায়িত্বরত সাংবাদিকদের মধ্যে সাম্প্রতিক বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। রাকসু ভিপির এক বিতর্কিত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি প্রধান সাংবাদিক সংগঠন রাকসুর সব ধরনের সংবাদ ও কর্মসূচি বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে ভিপিকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত গত ২৭ জুলাইয়ের এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রী ওই বিভাগেরই শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল কর্মী মহসিন আলমের বিরুদ্ধে হেনস্তা ও হুমকির অভিযোগ এনে প্রক্টর দপ্তরে আবেদন করেন। এই বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান অভিযুক্ত মহসিনকে তলব করেন। ওই সময় প্রক্টর দপ্তরে সাবেক এক ছাত্রলীগ কর্মী আনাস উপস্থিত হয়ে প্রক্টরের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে আনাসের মোবাইলে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার দাবি করে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ও এজিএস সালমান সাব্বিরসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাকে মারধর করেন।
এরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ ওঠে, ছাত্রলীগ কর্মী আনাস ও তার সহযোগীরা রাকসু ভবনে হামলা চালায়, যাতে জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ও তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস সাকিব আহত হন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে।
এ ঘটনার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম নিয়ে আপত্তি জানিয়ে গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করেন রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। সেখানে তিনি কিছু সংবাদমাধ্যমকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ আখ্যা দিয়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন এবং ‘ছাত্রলীগের প্রতি মায়াকান্না’ দেখাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন।
রাকসু ভিপির এই বক্তব্যের প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব, সাংবাদিক সমিতি ও রিপোর্টার্স ইউনিটি যৌথভাবে রাকসু বয়কটের ঘোষণা দেয়। সাংবাদিক নেতারা বলেন, জুলাই আন্দোলনের আগেও সাংবাদিকদের এভাবে রাজনৈতিক ট্যাগিং করে ভয়ভীতি দেখানো হতো। একজন ছাত্র প্রতিনিধি হয়ে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়া বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার ভিপির নেই।
রাবি প্রেসক্লাবের সভাপতি আশিকুল ইসলাম ধ্রুব বলেন, “ভিপি সব সাংবাদিককে জড়িয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা নিন্দনীয়। কোনো নির্দিষ্ট সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তিনি সংগঠনের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। তাঁর এই দায়িত্ব স্থায়ী নয়।” সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মীর কাদির বলেন, “ভিপির বক্তব্য আমাদের কাছে স্পষ্ট হুমকি ও রাজনৈতিক ট্যাগিং মনে হয়েছে।”
তবে নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “এটি মূলত ভুল বোঝাবুঝি। আমি কেবল ফ্যাসিস্ট সহযোগী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছি, পুরো সাংবাদিক সমাজের বিরুদ্ধে নয়। পেশাদার সাংবাদিকদের প্রতি আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ফরিদুল ইসলাম এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “প্রশাসন বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। শুধু রাকসু ভিপি নন, দায়িত্বশীল পদে থাকা সবারই আচরণ ও কথাবার্তায় সংযম থাকা উচিত। পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত হওয়া জরুরি।”
প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান জানান, বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর প্রকৃত তথ্য সবার সামনে তুলে ধরা হবে এবং ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments