Image description

আজিজুল বারী হেলাল

১৯৭৫ সালের নভেম্বরে সিপাহী বিদ্রোহ ও পাল্টা বিদ্রোহের ফলে রাষ্ট্রক্ষমতায় যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, সেই শূন্যতা পূরণে বিপ্লবী সৈনিকরা সেনানিবাসে বন্দি সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন। ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর—মাত্র চার দিনের এই সংক্ষিপ্ত সময়ের রাজনৈতিক বিপ্লবে ঢাকা সেনানিবাস ও বঙ্গভবনের মধ্যকার যে টানাপোড়েন ও দ্বন্দ্ব সংঘটিত হয়, তা শুধু ক্ষমতার পালাবদল ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় চরিত্র রক্ষার এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম।

অনেকের মতে, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ছিল আধিপত্যবাদী স্বার্থের প্রত্যক্ষ প্রতিফলন। এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে ফেলা হয় এবং দেশকে পুনরায় এক বিশেষ বলয়ের অধীনস্থ করার অপচেষ্টা চলে। এর বিপরীতে ৭ নভেম্বর সংগঠিত হয় সিপাহী-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ও ঐতিহাসিক পাল্টা প্রতিরোধ। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার একাংশ এবং কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলাভঙ্গের যে প্রয়াস চালানো হয়েছিল, তা মূলত রাষ্ট্রের পেশাদার সামরিক বাহিনীর ভিতকেই আঘাত করেছিল। সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে ফেলার এই বিপজ্জনক পদক্ষেপের কারণেই পরবর্তীতে কর্নেল তাহেরের বিচার অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কারণ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের পেশাদার সেনাবাহিনী কখনো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক এজেন্ডার হাতিয়ার হতে পারে না।

৭ নভেম্বরের ভোরে সিপাহীরা সেনানিবাসে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। সাঁজোয়া যানের ওপর দাঁড়িয়ে সৈনিক ও জনতার উল্লাস, ফুলের মালা আর স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথ। এই দৃশ্যই প্রমাণ করে যে, এটি নিছক সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না—এটি ছিল সিপাহী ও জনতার এক সম্মিলিত বিপ্লব। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশ তৎকালীন একক ভূরাজনৈতিক বলয় থেকে বেরিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ স্বাধীন কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রবেশ করে। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এই মৌলিক রূপান্তরই ৭ নভেম্বরের অন্যতম ঐতিহাসিক তাৎপর্য।

১৯৭১ সালে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা যেমন ইতিহাসের অনিবার্যতা ছিল, তেমনি ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার শূন্যতা পূরণে রাজনীতির পাদপীঠে আসীন হওয়াও ছিল ইতিহাসেরই এক অনিবার্য পরিণতি। ফরাসি বিপ্লবের সন্তান যেমন ছিলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, তেমনি ৭৫-এর নভেম্বরের বিপ্লবের সন্তান হচ্ছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার মূল চেতনা হিসেবে স্বীকৃত হলেও তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা ১৯৭২ সালের সংবিধানে জনমতের তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে ধর্মনিরপেক্ষতার অলীক চাদরে আবৃত করেন। জাতীয়তা হিসেবে অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জাতিসত্তাকে উপেক্ষা করে সমগ্র জনগোষ্ঠীর ওপর আংশিক নৃতাত্ত্বিক ‘বাঙালি’ পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

রাজনীতিবিদ জিয়া তাই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বিশ্বাসকে বিবেচনা করে ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে সংবিধানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ লিপিবদ্ধ করেন। বহুজাতিক ও বহুভাষিক বাংলাদেশে ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনে তিনি ‘বাঙালি’র পরিবর্তে সর্বজনীন ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করেন এবং সমাজতন্ত্রের ধারণার বিপরীতে সামাজিক সুবিচার ও অর্থনৈতিক সমতার রূপরেখা দেন।

স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, মস্কোপন্থী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি একীভূত হয়ে ‘বাকশাল’ গঠন করে এবং অন্যান্য সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করে। রাজনীতিবিদ জিয়া এর বিপরীতে পুনরুজ্জীবিত করেন বহুদলীয় গণতন্ত্র, অর্থাৎ সকল রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষকে উন্মুক্ত রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেন।

সৈনিক জিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়া এবং রাজনীতিবিদ জিয়ার জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের রাজনৈতিক দর্শন জনগণের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য, তা যাচাইয়ের জন্য দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দেড় বছরের মাথায় ১৯৭৭ সালে দেশে প্রথমবারের মতো গণভোটের আয়োজন করা হয় এবং তিনি জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন লাভ করেন।

পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন এবং জুন মাসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ের ধারাবাহিকতায়, একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত ৭ নভেম্বরের বিপ্লবই বিএনপির জন্মসূত্র ও মূল প্রেরণা। এই দিনটিতেই জাতীয় সংহতি, সার্বভৌমত্ব ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের যে ভিত রচিত হয়েছিল, তারই রাজনৈতিক রূপ হচ্ছে বিএনপি।

তাই ৭ নভেম্বর নিছক কোনো সাধারণ তারিখ নয়; এটি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’। এটি বাংলাদেশের আত্মপরিচয়, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে প্রত্যাবর্তনের জন্মদিন।

লেখক: সংসদ সদস্য ও তথ্য বিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি।