যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মুসলিম রাজনীতিকদের বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য জয় দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে। মিশিগান থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সায়েদ নির্বাচিত হয়েছেন দেশটির প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে। নিউ জার্সি থেকে প্রথম মুসলিম কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন চিকিৎসক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা আদম হামাওয়ি।
এ ছাড়া বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় মুসলিম ও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রাজনীতিকদের জয়ও আলোচনায় এসেছে। ইলিনয়ের অঙ্গরাজ্য সিনেটে নাবিলা সৈয়দের জয় এবং জর্জিয়ার অঙ্গরাজ্য সিনেটে রুয়া রোমানের নির্বাচিত হওয়া মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য
মুসলিমদের উল্লেখযোগ্য অর্জন
আবদুল আল-সায়েদ—যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর
মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট ৪২ বছর বয়সী চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবদুল আল-সায়েদ। তাঁর জয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেটে নির্বাচিত হলেন তিনি।
সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আল-সায়েদ নির্বাচনি প্রচারে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, করপোরেট প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা এবং ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবিও তাঁর প্রচারে গুরুত্ব পায়।
আদম হামাওয়ি—নিউ জার্সির প্রথম মুসলিম কংগ্রেস সদস্য
নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান গ্রেগ মেলেকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট আদম হামাওয়ি। তাঁর বিজয়ের মধ্য দিয়ে নিউ জার্সি থেকে প্রথম মুসলিম হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচিত হলেন তিনি।
মিসরীয় বংশোদ্ভূত হামাওয়ি একজন প্লাস্টিক ও পুনর্গঠনমূলক সার্জন এবং সাবেক মার্কিন সেনা চিকিৎসক। ইরাক যুদ্ধে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০২৪ সালে গাজায় স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসক হিসেবেও কাজ করেন। নির্বাচনি প্রচারে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা ও শিক্ষাঋণ মওকুফ এবং ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
নাবিলা সৈয়দ—ইলিনয় সিনেটে মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় প্রতিনিধিত্ব
ইলিনয়ের অঙ্গরাজ্য সিনেটের ২৬তম ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান ডারবি হিলসকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট নাবিলা সৈয়দ। তাঁর জয়ের মধ্য দিয়ে আসনটি রিপাবলিকানদের কাছ থেকে ডেমোক্র্যাটদের দখলে এসেছে।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম নাবিলা ২০২২ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ইলিনয়ের প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে থেকে পড়াশোনা করা এই রাজনীতিক ভোক্তা অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা ও ভোটাধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। অঙ্গরাজ্য সিনেটে নির্বাচিত হয়ে এবার আইন প্রণয়নে আরও বড় পরিসরে ভূমিকা রাখার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি।
আবের কাওয়াস—নিউইয়র্কে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মুসলিম নারীর জয়
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেটের ১২তম ডিস্ট্রিক্টে জয় পেয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মুসলিম নারী আবের কাওয়াস। তাঁর জয়ের মধ্য দিয়ে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মুসলিম নারীর প্রতিনিধিত্বের নতুন অধ্যায় তৈরি হয়েছে।
কুইন্সের বাসিন্দা কাওয়াস একজন কমিউনিটি সংগঠক। তাঁর বাবা-মা ফিলিস্তিনি। আবাসন ও ভাড়াটিয়াদের অধিকার, অভিবাসীদের সুরক্ষা, শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার ছিল তাঁর নির্বাচনি প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রুয়া রোমান—জর্জিয়ার অঙ্গরাজ্য সিনেটে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব
জর্জিয়ার অঙ্গরাজ্য সিনেটের ৭ম ডিস্ট্রিক্টে জয় পেয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট রুয়া রোমান। ২০২২ সালে জর্জিয়ার প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়ে তিনি অঙ্গরাজ্যটির প্রথম মুসলিম নারী ও প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান আইনপ্রণেতা হিসেবে ইতিহাস গড়েছিলেন। এবার সিনেটে নির্বাচিত হয়ে উচ্চকক্ষে যাওয়ার পথ তৈরি করেছেন তিনি।
নির্বাচনের আগে অভিবাসী অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন রোমান। তাঁর এ জয় জর্জিয়ার রাজনীতিতে মুসলিম ও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধিত্বের নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইলহান ওমর—কংগ্রেসে আবারও নির্বাচিত
মিনেসোটার ৫ম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট ইলহান ওমর। সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিক শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। ২০১৮ সালে কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়ে তিনি রাশিদা তালিবের সঙ্গে দেশটির প্রথম দুই মুসলিম নারী কংগ্রেস সদস্যের একজন হন।
কংগ্রেসে দায়িত্ব পালনকালে অভিবাসীদের অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে সরব ছিলেন তিনি। তাঁর পুনর্নির্বাচন মার্কিন কংগ্রেসে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখল।
রাশিদা তালিব—ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মুসলিম কংগ্রেস সদস্যের জয়
মিশিগানের ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট রাশিদা তালিব। ফিলিস্তিনি অভিবাসী পরিবারের সন্তান তালিব ২০১৮ সালে কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়ে প্রথম মুসলিম নারী সদস্যদের একজন হিসেবে ইতিহাস গড়েন। একই সঙ্গে তিনি কংগ্রেসের প্রথম দুই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন আইনপ্রণেতার একজন।
কংগ্রেসে তিনি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, পরিবেশ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে কাজ করেছেন। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানেরও কঠোর সমালোচক তিনি।
আন্দ্রে কারসন—কংগ্রেসে দীর্ঘদিনের মুসলিম প্রতিনিধি
ইন্ডিয়ানার ৭ম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে আবারও নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট আন্দ্রে কারসন। ২০০৮ সালে বিশেষ নির্বাচনে জয়ী হয়ে কংগ্রেসে আসেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচিত দ্বিতীয় মুসলিম সদস্য কারসন। তাঁর আগে মিনেসোটা থেকে কিথ এলিসন প্রথম মুসলিম হিসেবে কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
কারসন কংগ্রেসের গোয়েন্দাবিষয়ক স্থায়ী কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। সন্ত্রাসবাদ, পাল্টা গোয়েন্দা কার্যক্রম ও নিরাপত্তার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, অভিবাসন, পরিবহন ও কর্মসংস্থান নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। এবারের নির্বাচনে জয়ী হয়ে কংগ্রেসে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছেন।
কংগ্রেসে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব বাড়ল
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অন্তত সাতজন মুসলিম প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে জয় পেয়েছেন বলে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। তাঁদের মধ্যে আবদুল আল-সায়েদ ও আদম হামাওয়ি নতুন ইতিহাস গড়েছেন। অন্যদিকে ইলহান ওমর, রাশিদা তালিব ও আন্দ্রে কারসনের মতো বিদায়ী সদস্যরা পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। নিউইয়র্কের ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ারের জয়ও মুসলিম প্রতিনিধিত্বের আলোচনায় এসেছে।
এসব ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম ও অভিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং প্রতিনিধিত্বের বিস্তারের দিকটি সামনে এনেছে। তবে কংগ্রেসের নির্বাচন ও অঙ্গরাজ্যের আইনসভার নির্বাচন আলাদা—তাই দুই ধরনের অর্জনকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
এনএ




Comments