Image description

মাগুরায় ১৫০ ভরি স্বর্ণ ডাকাতির ঘটনায় লুট করা স্বর্ণের ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে বিরোধের জেরেই পৌর যুবদল নেতা সাকের হোসেনকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী হিসেবে মারুফ হোসেনের নাম উল্লেখ করেছে পুলিশ। সাকেরকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক গোলাম জাহিদের যমুনা ব্যাংকের হিসাবে ২০ লাখ টাকা পাঠান মারুফ। এর আগে স্বর্ণের ভাগ নিয়ে বিরোধ মেটাতে সাকেরকে ৫ লাখ টাকা দেওয়া হলেও তাতে সন্তুষ্ট হননি তিনি।

বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে মাগুরা পুলিশ লাইনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার জানান, ১৫০ ভরি স্বর্ণ ডাকাতির পর লুট করা স্বর্ণ নিজের কাছে রেখে দেন মারুফ হোসেন। স্বর্ণের ভাগ না পেয়ে সাকের হোসেন বারবার তাঁর কাছে নিজের অংশ বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক গোলাম জাহিদ উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেন। সেখানে মারুফকে সাকেরকে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। মারুফ ওই টাকা দিলেও তাতে সন্তুষ্ট হননি সাকের। তিনি স্বর্ণের ভাগ বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিতে অনড় থাকেন।

পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, সাকেরের এমন চাপের মুখে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মারুফ। একপর্যায়ে তিনি গোলাম জাহিদকে সাকেরকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। পরে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গোলাম জাহিদের যমুনা ব্যাংকের হিসাবে ২০ লাখ টাকা পাঠান মারুফ। এরপরই সাকেরকে হত্যা করা হয় বলে দাবি পুলিশের।

পুলিশ জানিয়েছে, পৃথক দুটি মামলার তদন্তে ১৫০ ভরি স্বর্ণ ডাকাতি ও সাকের হোসেন হত্যাকাণ্ডের মধ্যে যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে ডাকাতির স্বর্ণের অংশবিশেষ, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বুলেট, খালি কার্তুজসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে মাগুরা সদর উপজেলার রামনগর বাজার এলাকায় গোল্ডেন লাইন পরিবহনের একটি বাসে পুলিশ পরিচয়ে ওঠে ১২ থেকে ১৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র। পরে স্বর্ণ ব্যবসায়ী মো. মজিবর রহমানকে বাস থেকে নামিয়ে হলিনগর গ্রামের নিখিল মাস্টারের মেহগনিবাগানে নিয়ে যায় তারা। সেখানে ভয়ভীতি দেখিয়ে ও মারধর করে তাঁর কাছ থেকে ১৫০ ভরি স্বর্ণ এবং নগদ ৬০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। লুট হওয়া স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

এ ঘটনায় মাগুরা সদর থানায় মামলা হওয়ার পর তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁরা হলেন মো. জুয়েল হোসেন (৪৭), তৌকির আহমেদ (২৫), মো. ফরিদ মণ্ডল (৫৯), মো. মিল্টন মোল্যা (৩৫), মারুফা আক্তার (৩২), মো. গোলাম জাহিদ (৪৫) ও মো. মারুফ হোসেন (৪৪)।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ৯ ভরি ৭ আনা ৫ রতি ওজনের একটি তেজাবি কাটা স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত ইয়ামাহা এক্সএসআর ও পালসার মডেলের দুটি মোটরসাইকেল এবং রুপালি রঙের একটি টয়োটা ভিটজ গাড়ি জব্দ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, গত ২১ অক্টোবর ভোর সাড়ে ৫টার দিকে মাগুরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের রয়েল এক্সপ্রেস কাউন্টারে মোটরসাইকেলে এসে পৌর যুবদল নেতা সাকের হোসেনকে (৩৬) মাথায় গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী শারমিনাহার রুমা বাদী হয়ে মাগুরা সদর থানায় হত্যা মামলা করেন।

হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে পুলিশ আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁরা হলেন রনি শিকদার (৩৮), শামীমা তাবাসসুম (৩১), অনিমেষ মজুমদার (৫৫), মো. মারুফ হোসেন (৪৪), মো. গোলাম জাহিদ (৪৫) ও বশির আলী (৩৫)। তাঁদের কাছ থেকে বুলেট, খালি কার্তুজ এবং ৫১ দশমিক ৯ ভরি ওজনের পাঁচটি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুটি মামলায় মোট ৬১ ভরি ৬ আনা স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে, যার ওজন ৭১৬ দশমিক ৪৬ গ্রাম। দুই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন মোট ১১ জন।

পুলিশ আরও জানায়, দুটি মামলায় জড়িত থাকার বিষয়ে গ্রেপ্তার গোলাম জাহিদ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন, পিপিএম (সেবা)-এর নির্দেশনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) থান্দার খায়রুল হাসান, পিপিএমের নেতৃত্বে এসব অভিযান পরিচালিত হয়।

এসএ