সংবিধান সংস্কার নাকি সংবিধান সংশোধন এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় জুলাই জাতীয় সনদের ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না এলে বিষয়টি সংসদ ছাড়িয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে একচুলও সরতে রাজি নয়। ফলে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন, গণভোটের ফল এবং সংসদের সাংবিধানিক ভূমিকা ঘিরে নতুন রাজনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংবিধান সংস্কার কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে, সেগুলো কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিশ্চিত নয়। তবে তা ঠিক করবে সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে এই সঙ্কট চরম আকার ধারণ করতে পারে।
সংসদে শুরু থেকেই দ্বিমত: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই এই ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। সূত্র বলছে, সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার কমিটির সদস্য হিসেবেও পৃথক শপথ নেন। তবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা শুধু এমপি হিসেবে শপথ নিলেও ওই কমিটির সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। এরপর থেকেই বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বিরোধী জোটের দাবি, গণভোটে জনগণের অনুমোদন পাওয়া জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে অবিকল বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যদিকে সরকার বলছে, বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখেই সংশোধনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা সম্ভব।
গত ৩১ মার্চে সংসদে আলোচনায় সরকারি দলের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হয়। বিএনপি এই সংস্কার পরিষদ বা সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ৩১ মার্চের আলোচনায় বলেছেন, এই আদেশ আসলে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল’। তিনি আরো জানান, ১৩৩টা অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ আনা হয়নি। কারণ এটা না অধ্যাদেশ, না আইন। তার মতে, কোনো আদেশের মাধ্যমে এই সার্বভৌম সংসদকে ১৮০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করতে বাধ্য করা যায় না।
জুলাই সনদের প্রেক্ষাপট: সূত্র মতে, জুলাই আন্দোলনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার বিভিন্ন খাতের সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর গত বছরের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ সই করা হয়। এই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি ছিল সরাসরি সংবিধান সংক্রান্ত। এর মধ্যে ৩০টি প্রস্তাবের বিষয়ে একমত হয়েছিল বিএনপি। আর কয়েকটি প্রস্তাবে ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) জানিয়েই শেষ পর্যন্ত অন্য দলগুলোর সাথে ঐক্যে যায় দলটি। সনদটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। এর পরপরই জনগণের সম্মতি যাচাইয়ের জন্য ২৫ নভেম্বর জারি হয় ‘গণভোট অধ্যাদেশ’। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই একই সাথে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। জুলাই সনদে বলা হয়, নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি এই পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করবেন। যার শেষ সময়সীমা ছিল গত ১৫ মার্চ। সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করার কথা।
শপথ নিয়েও বিতর্ক: নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার কমিটির সদস্য হিসেবেও শপথ নেন। তবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা দ্বিতীয় শপথে অংশ নেননি। এরপর থেকেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈধতা, কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যত্ ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
সরকারের অবস্থান: সরকারের ভাষ্য, সংবিধান সংশোধনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুযোগ রয়েছে। বিএনপির নেতারা বলছেন, সংবিধানের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো সাংবিধানিক কাঠামো তৈরির প্রয়োজন নেই। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, রাষ্ট্রের সামনে তিনটি পথ ছিল। নতুন সংবিধান প্রণয়ন, বিদ্যমান সংবিধান স্থগিত রাখা অথবা সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা। সরকার তৃতীয় পথটিকেই বাস্তবসম্মত মনে করছে।
এদিকে সংসদে আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত আদেশ সংসদকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে বাধ্য করতে পারে না। তাঁর মতে, সংসদের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব কোনো প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ করা যায় না।
বিরোধী জোটের পাল্টা যুক্তি: জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট বলছে, সংবিধান সংশোধন ও সংবিধান সংস্কার একই বিষয় নয়। তাদের মতে, সংশোধন বলতে কয়েকটি ধারা বা শব্দ পরিবর্তনকে বোঝায়, আর সংস্কার হলো রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আনা। সার্বিক বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি তাদের ৩১ দফার প্রথম দফাতেই সংবিধান সংস্কারের অঙ্গীকার করেছে। এখন সেটিকে বাদ দিয়ে সংশোধনের কথা বলছে। সংস্কার আর সংশোধনে বিশাল ফারাক। সংশোধন হচ্ছে বক্তব্যের কিছু লাইন বা শব্দের যোগ বিয়োগ, কিছু কারেকশন। কিন্তু সংস্কার হলো সংবিধানের কাঠামোগত বিষয়ের মৌলিক পরিবর্তন। যে বিষয়গুলোর সংস্কারে গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ রায় দিয়েছে। তিনি বলেন, সরকারকে সংবিধান সংস্কারের দিকেই যেতে হবে। অন্যথায় সঙ্কট আরো বাড়বে এবং এর সমাধানে বিরোধীরা জনরায় বাস্তবায়নে রাজপথে থাকবে।
বিশ্লেষকেরা যা বলছেন: জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের মতে, বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে জুলাই আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়ন কঠিন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন বলেই সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নটি সামনে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গণভোটের রায় বাস্তবায়ন বিতর্ক যে সামনে আসবে, সেটা অজানা ছিল না। রাজনৈতিক দৃষ্টিতে যাচাই না করা, রাজনৈতিক মতৈক্যের অভাব, ঐকমত্য কমিশনের উচ্চাভিলাষ ও নিরপেক্ষতার অভাবে গণভোট বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জে পড়েছে। ফলে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্কট থেকে উত্তরণ করতে গিয়ে জাতি নতুন সঙ্কটে নিমজ্জিত হয়েছে।
অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের মতে, সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যের চেয়ে রাজনৈতিক অনমনীয়তাই এখন বড় সমস্যা। তিনি মনে করেন, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।




Comments