দল গোছাতে কাউন্সিলের প্রস্তুতি চলছে বিএনপির। চলতি বছরের শেষের দিকে কাউন্সিল হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে দলটির শীর্ষ নেতারা। তবে কমিটিতেও নেতৃত্বের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে নেতাদের মুখে। দীর্ঘদিন জাতীয় কাউন্সিল না হওয়ায় মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির পুনর্গঠন, তৃণমূলকে শক্তিশালী করা এবং কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব বেছে নেয়ার জন্য এই উদ্যোগ নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। যদিও কাউন্সিলের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি, তবে চলতি বছরের শেষ কিংবা আগামী বছরের শুরুতে তা আয়োজনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন দলীয় নেতারা।
এদিকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির অনেক সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতা সরকারের মন্ত্রণালয় সামলাচ্ছেন। দলের যেসব নেতা সংসদ-সদস্য হয়েছেন, তারাও সংসদীয় কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুততম সময়ে দল পুনর্গঠন করতে চান বিএনপি চেয়ারম্যান। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত এপ্রিলের শুরুতে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, জাতীয় কাউন্সিল করতে অন্তত কয়েক মাস লাগবে। তারা খুব দ্রুত দলকে কাউন্সিলের দিকে নেয়ার চেষ্টা করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দল গোছানোর কাজ চলছে। বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেয়া হচ্ছে।
বর্তমানে বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে বেশির ভাগ কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। দলটির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টি কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। কোথাও তিন বছর, কোথাও পাঁচ বছর, আবার কোথাও এক যুগ ধরে একই কমিটি বহাল রয়েছে। সাংগঠনিক ইউনিটের শীর্ষ অনেক নেতা সরকারের এমপি-মন্ত্রী। কেউ কেউ মনে করছেন, এতে সংগঠনের কার্যক্রমে কার্যত স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। কয়েকজন সংসদ-সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতা জানান, সরকারের পাশাপাশি দল পুনর্গঠনে জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়, ত্যাগী ও অপেক্ষাকৃত তরুণ রাজপথমুখী নেতাদের নেতৃত্বে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচনের কথাও বলছেন কেউ কেউ।
এদিকে বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের মার্চে। নিয়ম অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও এক দশকেও তা হয়নি। তবে এই সময়ে নির্বাহী কমিটিতে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে, যুক্ত হয়েছে নতুন মুখ। কেউ পদোন্নতি পেয়েছেন, আবার কেউ দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন। সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিএনপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। দলের শীর্ষ পদে থেকেই প্রথমবার নির্বাচনে সাফল্য দেখিয়েছেন তিনি। দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় এনে জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এ বছর না হলে আগামী বছরের শুরুতে দলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে। তার আগে জেলা ও মহানগর পর্যায়ে কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে দল পুনর্গঠন করার কথা রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একজন মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, সরকারের মেয়াদ সাড়ে চার মাস অতিবাহিত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে কার্যক্রম বাড়ছে। সরকারে মন্ত্রী-এমপিদের ব্যস্ততাও বেড়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান চাচ্ছেন রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি দ্রুত সময়ে দলকে সুসংগঠিত করতে এবং সেই অনুযায়ী কার্যক্রমও শুরু করেছেন তিনি। দলের নেতারা বলছেন, জাতীয় কাউন্সিল ও সংগঠনগুলোর কমিটি পুনর্গঠন করার আভাসে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে চাঙা ভাব এসেছে। এটি দলে গতি সঞ্চারে ভূমিকা রাখবে এবং দল সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হবে।
এদিকে দলীয় সূত্র জানায়, গত সপ্তাহ ঢাকা জেলা বিএনপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি ও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি আনা, শৃঙ্খলা রক্ষা, তৃণমূল পর্যায়কে আরও শক্তিশালী ও দলীয় ঐক্য সুসংহত করা এবং জনগণের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বাড়ানোর নির্দেশনা দেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সহযোগিতার কথা বলেন।
অন্যদিকে জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হলে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি এবং অন্যান্য অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গেও তারেক রহমানের বৈঠক হতে পারে। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য মহানগর ও জেলা বিএনপির নেতাদের সঙ্গেও তার বৈঠক করার কথা রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা জানান, গত সাড়ে চার মাসে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে সরকারকে একটি স্থিতিশীল ও সুদৃঢ় অবস্থানে নিয়ে এসেছে বিএনপি। কোথায় কী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং প্রশাসন কীভাবে চালাতে হবে, তা এখন নীতিনির্ধারকদের পুরোপুরি নখদর্পণে। সরকারের ভিত মজবুত করার পর এবার দলের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছেন তারেক রহমান।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু বলেন, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। তিনি আমাদের নেতাকর্মীদের খোঁজ নেন এবং সাংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান। দলকে শক্তিশালী করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। তবে বৈঠক সূত্র জানায়, তারেক রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন, অনেক কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব কমিটিকে পুনর্গঠিত করতে হবে এবং যেখানে সম্ভব কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। এতে সংগঠন আরও গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য হবে।




Comments