সবুজ ক্যাম্পাসে বিরল অতিথি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বস্তির আবাস পেয়েছে বিরল বামুনশালিক
সারা বছর দেখা মেলে বামুনশালিকের
ভোরের প্রথম আলো যখন ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরে ঝিলিক ছড়ায়, ঠিক তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বিস্তীর্ণ সবুজ চত্বরে দেখা মেলে এক চঞ্চল অতিথির। কখনো লাফিয়ে, কখনো দ্রুত ঠোঁট চালিয়ে মাটি থেকে পোকামাকড় তুলে নিতে ব্যস্ত এই পাখিটি দূর থেকে সাধারণ শালিক মনে হলেও কাছে গেলে চেনা যায় এর আভিজাত্য। মাথার কালো ঝুঁটি, রঙিন ঠোঁট আর চোখের নিচের নীল-হলুদ অনাবৃত চামড়া জানান দেয়—এটি বিরল ‘বামুনশালিক’, যাকে অনেকে ‘শঙ্খশালিক’ নামেও চেনেন।
দেশের অনেক অঞ্চলে এখন আর সহজে এই পাখির দেখা না মিললেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৭৫৩ একরের সবুজ ক্যাম্পাসে বছরের প্রতিটি ঋতুতেই নিশ্চিন্তে বিচরণ করছে এরা। নিরাপদ আবাস, পর্যাপ্ত খাদ্য এবং নিরিবিলি পরিবেশের কারণে ক্যাম্পাসটি এখন এই বিরল প্রজাতির অন্যতম নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। শুধু বিচরণই নয়, এখানে নিয়মিত প্রজননও করছে তারা।
খোলা তৃণভূমি, পুরোনো গাছ, ঝোপঝাড় আর ভেজা মাঠ বামুনশালিকের জন্য আদর্শ নিবাস। মাটিতে নেমে পোকামাকড় খুঁজলেও এরা গাছের ডালে বসে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে বেশি পছন্দ করে। অন্য শালিকের তুলনায় এদের ওড়ার গতি বেশি এবং এরা অন্য পাখির ডাক অনুকরণেও বেশ পারদর্শী। সাধারণত একা বা জোড়ায় দেখা গেলেও খাদ্যের প্রাচুর্য থাকলে এদের ছোট ছোট দলে বিচরণ করতে দেখা যায়।
প্রায় ২১ সেন্টিমিটার লম্বা এই পাখির স্ত্রী ও পুরুষ দেখতে প্রায় একই রকম। এদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো মাথাজুড়ে কালো পালক ও ঘাড় পর্যন্ত বিস্তৃত ঝুঁটি। শরীরের ওপরের অংশ ধূসর, গলা ও লেজে পাটকিলে আভা এবং লেজের নিচে সাদা ছোপ রয়েছে। শক্ত ঠোঁটে নীল, সবুজ ও হলুদের মিশেল এবং উজ্জ্বল হলুদ পা পাখিটিকে দারুণ সৌন্দর্য দান করেছে। তবে অল্পবয়সী বামুনশালিকের মাথায় ঝুঁটি থাকে না এবং শরীরের নিচের অংশ কিছুটা ফ্যাকাশে কমলা রঙের হয়।
পুরোনো গাছের কোটর, দেয়ালের ফাঁকা অংশ কিংবা পরিত্যক্ত গহ্বরে এরা বাসা বাঁধে। প্রজনন মৌসুম মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত। এ সময় পুরুষ পাখি মাথার ঝুঁটি খাড়া করে সুরেলা কণ্ঠে ডাক দেয়। এরা সাধারণত তিন থেকে চারটি নীলচে রঙের ডিম পাড়ে। এদের প্রিয় খাদ্যের তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ফল, পোকামাকড়, ফুলের মধু এবং বিশেষ করে পাকা জাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ফাহিম মুন্তাসির রাফিন বলেন, "২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম সিরাজী ভবনের পেছনে বামুনশালিকের দেখা পাই। এরপর থেকে ক্যাম্পাসের পশ্চিমপাড়া, সিলসিলা এলাকা, শহীদ মিনার, হেলিপ্যাড ও জুবেরি এলাকাসহ প্রায় পুরো ক্যাম্পাসেই এদের বিচরণ লক্ষ্য করেছি। বিশেষ করে ডাস্টবিনের আশপাশে খাবারের খোঁজে এদের বেশি দেখা যায়।" পাখিদের সংরক্ষণে প্রজনন মৌসুমে এদের বিরক্ত না করা এবং বহিরাগতদের হাত থেকে পাখির ছানা রক্ষায় প্রশাসনের কড়া নজরদারির দাবি জানান তিনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও পাখি গবেষক ড. আমিনুজ্জামান মো. সালেহ রেজা বলেন, "খাদ্য, নিরাপদ আবাস, নিরাপত্তা ও অনুকূল পরিবেশ—এই চারটি উপাদানের উপস্থিতির কারণেই বামুনশালিক এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস ও বংশবিস্তার করছে। আমাদের এই অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।"
তিনি আরও জানান, রাজশাহী অঞ্চলে এই পাখির উপস্থিতি অন্য অঞ্চলের তুলনায় কিছুটা বেশি। নতুন কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে নয়, বরং বিদ্যমান প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করলেই এই বিরল পাখিরা ক্যাম্পাসে টিকে থাকবে।
প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর এই ক্যাম্পাসে বামুনশালিকের অবাধ ওড়াউড়ি জীববৈচিত্র্য রক্ষার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রকৃতির এই নীরব অতিথিদের রক্ষা করতে প্রয়োজন কেবল মানুষের সচেতনতা ও সবুজের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments