রাবিতে র্যাগিং, হামলা ও সিল জালিয়াতিতে ৯৯ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) র্যাগিং, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, শারীরিক হামলা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল সিল জালিয়াতির মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ৯৯ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অপরাধের মাত্রাভেদে নেওয়া এসব শাস্তির মধ্যে রয়েছে— এক শিক্ষাবর্ষ (দুই সেমিস্টার) ছাত্রত্ব স্থগিত (বহিষ্কার), হলের আবাসিকতা বাতিল, ভবিষ্যতে হলে সিটের জন্য অযোগ্য ঘোষণা, কঠোর সতর্কীকরণ এবং অভিভাবকদের লিখিত চিঠির মাধ্যমে বিষয়ে বিস্তারিত অবহিতকরণ।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাবির দুই সিন্ডিকেট সদস্যের মাধ্যমে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর আগে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ৫৪৯তম সিন্ডিকেট সভায় এসব সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।
সিন্ডিকেট সূত্র জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক বিভাগের মোট ৯৯ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন অপরাধে এ শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে র্যাগিংয়ের ভয়াবহ অভিযোগে ১৪ জন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিল জালিয়াতির দায়ে ৩ জন এবং জুনিয়র শিক্ষার্থী কর্তৃক সিনিয়রের ওপর শারীরিক হামলার অভিযোগে ১ জনসহ মোট ১৮ জনের বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রত্ব ১ বছরের জন্য সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২ জন শিক্ষার্থীর হলের আবাসিকতা স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছে। আর এক বছরের বহিস্কারাদেশ পাওয়া ১৮ জনসহ মোট ২০ শিক্ষার্থীকে রাবির কোনো আবাসিক হলে ভবিষ্যতে সিট বরাদ্দের সুযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।
অন্যদিকে, র্যাগিংয়ের ঘটনায় পরোক্ষ মদদ ও সম্পৃক্ততার দায়ে বিভিন্ন বিভাগের আরও ৭৯ জন শিক্ষার্থীকে চূড়ান্ত ও কঠোর বার্তা (সতর্কীকরণ) দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে তাঁদের বিরুদ্ধে র্যাগিং বা শৃঙ্খলাভঙ্গের সামান্যতম অভিযোগ মিললে সরাসরি স্থায়ী বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। সাজাপ্রাপ্ত সব শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের কাছে ডাকযোগে চিঠি পাঠিয়ে বিষয়টি জানানো হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডিসিপ্লিনারি বোর্ড-২০২৬’-এ উত্থাপিত অভিযোগের বিস্তারিত তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দণ্ডপ্রাপ্ত ৯৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের ৩১ জন। এ ছাড়া ইতিহাস বিভাগের ১৮ জন, লোকপ্রশাসন বিভাগের ১৫ জন, ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের ১৩ জন, অ্যাগ্রোনমি অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার এক্সটেনশন বিভাগের ৭ জন, চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের ৪ জন, শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের ৪ জন, চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের ৪ জন, অর্থনীতি বিভাগের ২ জন এবং গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের ১ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন।
এ বিষয়ে রাবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান জানান, ‘‘ডিসিপ্লিনারি বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী র্যাগিং, বিভাগের মারামারি এবং সিল জালিয়াতির ঘটনায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী বিষয়ে গতকাল অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় আলোচনা হয়েছে শুনেছি। তবে আমি সিন্ডিকেটের সদস্য না হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছি না।
তিনি বলেন, ডিসিপ্লিনারি বোর্ডের সুপারিশ বহাল থাকলে র্যাগিংয়ের ঘটনায় কেউ কঠোর শাস্তি, কেউ সতর্কতামূলক শাস্তি এবং কারও হলের আবাসিকতা স্থায়ীভাবে বাতিল হতে পারে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের পরিবারের কাছে চিঠি দিয়ে তাদের সন্তানদের বিষয়ে অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
প্রক্টর আরও বলেন, শাস্তির উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের ধ্বংস করা নয়, বরং ভুল থেকে তাদের ফিরিয়ে এনে ভবিষ্যৎ জীবন সুন্দর করার সুযোগ দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি অভিভাবকদেরও বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত রাখতে চায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘‘র্যাগিংয়ের ঘটনায় ডিসিপ্লিনারি বোর্ডের সিদ্ধান্ত গতকাল সিন্ডিকেট সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে প্রায় শত শিক্ষার্থীকে র্যাগিংয়ের অভিযোগে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য ছাত্রত্ব স্থগিত, আবাসিকতা বাতিল ও কঠোর সতর্কতাসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি রয়েছে।’’
উপাচার্য আরও জানান, ‘‘শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বার্তা থাকবে র্যাগিংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে কোনো ধরনের কম্প্রোমাইজ করবে না বর্তমান প্রশাসন। এছাড়াও আরও বেশকিছু বিভাগ উপকমিটিতে তদন্তনাধীন রয়েছে, পরবর্তী সিন্ডিকেটে তাদের বিষয়েও সিদ্ধান্ত আসবে।’’
ডিআর




Comments