চুয়েটের নবনিযুক্ত ভিসিকে ঠেকাতে ‘গোপন প্ল্যান’
হল খালি ও সড়ক অবরোধের ছক
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের আগমন ঠেকাতে গোপন পরিকল্পনার করার অভিযোগ উঠেছে শিক্ষক সমিতির একটি অংশের বিরুদ্ধে। যেখানে শিক্ষার্থীদের দিয়ে আন্দোলনকে চাঙ্গা রাখতে হল ফাঁকা করা, শিক্ষার্থীদের সামনে রেখে সড়ক অবরোধ করাসহ সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানা পরিকল্পনার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাতে চুয়েটের জামায়াত ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকরা অনলাইন যোগাযোগ ও ভিডিও কনফারেন্সিং প্ল্যাটফর্ম জুম সভায় অংশ নিয়ে এই পরিকল্পনা করেন।
মানবকণ্ঠের হাতে আসা কয়েকটি অডিও ক্লিপ বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের দিয়ে আন্দোলনকে চাঙ্গা রাখতে হল ফাঁকা করা, শিক্ষার্থীদের সামনে রেখে সড়ক অবরোধ করে সরকারকে বেকায়দা ফেলতেই এই পরিকল্পনা।
অডিও ক্লিপে যা আছে
প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি অডিও ক্লিপে এক শিক্ষককে বলতে শোনা যায়, ‘প্রোভোস্ট ও হল প্রশাসনের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হল খালি করার কৌশল নিতে হবে। হলের বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রী চলে গেছে। যেখানে ১০০ থেকে ১৫০ জন আছে, তাদের হল ব্র্যাকেট করে বের করে দেব। এক মাস পর ডাকলে স্যুট-ট্যুট পরে আসবে, তখন অটোমেটিক্যালি মেনে নেবে।’
নতুন উপাচার্য যাতে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পারেন, সেজন্য ছাত্রদের ব্যবহার করে গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধের পরিকল্পনাও ব্যক্ত করেন এক শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘আগামীকাল যেন (ভিসি) গাড়ি নিয়ে ঢুকতে না পারে, আমরা কিছু ছাত্রদেরকে দিয়ে গাছের গুঁড়ি রাস্তায় ফেলে দিই, তাহলে ভালো হবে। এতে তারা নিরাপদে আসতে বাধাগ্রস্ত হবে।’
অডিওতে আরেক শিক্ষককে বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, তাঁর ছেলে ইসরাফিল খসরু ও বর্তমান ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালের সাথে যোগাযোগের প্রস্তাব দিতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের আরো তিনটি সমিতি একসাথে অ্যালাইন হয়ে আন্দোলন করেছি। ওনাদের সাথে বসে সিদ্ধান্ত জানাব।’
অধ্যাপক ড. ফৌজিয়া গুলশান রশিদ লোপা বলতে শোনা যায়, ‘ছাত্ররা যখন বাধা দেবে, আমরা শিক্ষকরাও বাধা দেব। তখন ঢুকতে পারবেন না। যে শিক্ষাবিদ পুলিশ বাহিনী নিয়ে ঢুকবেন, সে শিক্ষক আমাদের দরকার নেই। তারা আমাদের চেইনে হাত দিলে তাদের হাত ভেঙে দিতে হবে। তখনই একাত্মতা ঘোষণা হবে।’
তবে এই কঠোর অবস্থানের বিরোধিতা করে এক শিক্ষক বলেন, ‘আমরা শেখ শরীফুল নামক এক কুলাঙ্গারের জন্য এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছি, এখান থেকে এসে থ্রেট খেতে হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে সমিতির সবার সমর্থন পাচ্ছি না।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সভায় বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদস্য ড. শেখ মুহাম্মদ হুমায়ুন কবির, আওয়ামী পন্থী শিক্ষক প্রফেসর ড. মঈনুল ইসলাম, প্রফেসর ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান, জামায়াতপন্থী শিক্ষক ড. বশির জিসান, ড. মোস্তফা কামাল, ড. আহসানুল্লাহ, মোহাম্মদ শামসুজ সাদেকিন, বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের নেতা প্রফেসর ড. ফৌজিয়া গুলশান রশিদ লোপা, বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের নেতা প্রফেসর উদয় প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে, গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণ করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২৪ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি চুয়েটের ভাইস-চ্যান্সেলর পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওইদিন তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে যোগদানপত্র পাঠান।
উল্লেখ্য, উপাচার্য পদে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের দায়িত্ব গ্রহণের ৫৬ দিনের মাথায় তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। তাঁর পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীরা সাবেক উপাচার্যের শিক্ষার্থীবান্ধব মনোভাব, সরাসরি যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ, একাডেমিক ও পেশাগত সুযোগ সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা, স্কলারশিপ ও শিক্ষার্থী বিনিময় পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তাদের মতে, এসব উদ্যোগ পূর্ণতা পাওয়ার আগেই উপাচার্য পরিবর্তন করা হয়েছে। তাই ৫৬ দিনের কর্মকাণ্ডের চেয়ে ওই সময়ে তৈরি হওয়া আস্থা, প্রশাসন-শিক্ষার্থী সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য তারা অধ্যাপক সায়েমের পুনর্বহাল চান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে শিক্ষক ড. শেখ মুহাম্মদ হুমায়ুন কবিরকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে পরবর্তীকালে শিক্ষক ড. ফৌজিয়া গুলশান রশিদ লোপা জুম মিটিংয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ছাত্রদের পক্ষে এবং সবসময় তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলি।’ গোপনে বৈঠক করে সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘আমি সবসময় সরকারের প্রতি অনুগত ও নীতি-নিয়মকে শ্রদ্ধা করি।’
এসএ




Comments