Image description

দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে আমদানিকৃত পণ্য খালাসে শুল্ক ফাঁকি ও ঘুষ বাণিজ্যের মহোৎসব থামছেই না। কাস্টমস হাউসের প্রভাবশালী ও দুর্নীতিগ্রস্ত কয়েকজন পুরোনো রাজস্ব কর্মকর্তার পাতানো ছকেই চলছে এই লাগামহীন অনিয়ম। নামমাত্র পরীক্ষণ আর ‘অন থার্ড’ (এক-তৃতীয়াংশ) ঘুষের বিনিময়ে উচ্চ শুল্কের পণ্য খালাস হচ্ছে নামমাত্র মূল্যে। এতে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

কাস্টমসের শুল্কায়ন ডাটাবেজ পর্যালোচনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ সব তথ্য। বিশেষ করে হাউসের শুল্কায়ন গ্রুপ-২-এর রাজস্ব কর্মকর্তা সনজু মিয়ার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের সাথে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা নাসিব আরিফিন যুক্ত হয়ে সাড়ে ৩ ডলার শুল্কায়নের পণ্য মাত্র ১ ডলার ২০ সেন্টে খালাসের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। মূলত সাবেক কমিশনার কামরুজ্জামানের আমলে গড়ে ওঠা এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটটি এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে, যার নেপথ্যে রয়েছেন দীর্ঘদিন একই স্টেশনে কর্মরত রাজস্ব কর্মকর্তা মনিউর ও আজহারুল।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত দেড় বছরে বেনাপোল বন্দরে শুল্ক গোয়েন্দা বাহিনীর কোনো দৃশ্যমান সফলতা নেই। বরং শুল্ক গোয়েন্দার নাম ভাঙিয়ে ‘লিটন’ নামে এক এনজিও কর্মীর মাধ্যমে ঘুষ সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। ফলে শুল্ক ফাঁকির এই ‘নীলনকশা’ প্রশাসনের চোখের সামনেই বাস্তবায়িত হচ্ছে।

ঢাকার আমদানিকারক আরিফ হাসান জানান, ভারত থেকে একই এইচএস কোডে (৩২০৮১০২০) আমদানিকৃত ‘ইনসুলেটিং বার্নিশ’ পণ্যে তাদের ২.৭৫ ডলার শুল্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে। অথচ একই পণ্য অন্য কিছু আমদানিকারককে কর্মকর্তা সনজু ও তার সহকারীরা বিশেষ চুক্তির বিনিময়ে মাত্র ১.২০ ডলারে খালাস দিয়েছেন। কাস্টমসের ডাটাবেজ অনুযায়ী, গত বছরের শেষ দিকে বি/ই-৮৯৯৬২ (৩ ডিসেম্বর), বি/ই-৮৭৭০১ (২৪ নভেম্বর) এবং বি/ই-৮৫৩৬৫ (১৬ নভেম্বর) নম্বর চালানগুলো অস্বাভাবিক কম শুল্কে খালাস করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট জানান, হাতেগোনা কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ীকে শুল্ক ফাঁকির সুযোগ দিতে নামমাত্র পরীক্ষণ রিপোর্ট দেওয়া হয়। পুরোনো কর্মকর্তারা নতুন কর্মকর্তাদেরও এই চক্রে টানার চেষ্টা করছেন। গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে এসব কর্মকর্তার মোবাইল কল রেকর্ড চেক করলেই এই ঘুষ বাণিজ্যের প্রমাণ মিলবে।

এদিকে, কাস্টমস কমিশনার খালেদ মোহাম্মদ আবু হোসেনের বদলির খবরে অনিয়মকারী চক্রটি আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা বিভিন্ন স্তরে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত রাজস্ব কর্মকর্তা সনজু মিয়ার বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন বলেন, “বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি। কমিশনার মহোদয়কে অবগত করে দ্রুতই এ বিষয়ে কার্যকরী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সরাসরি হস্তক্ষেপ জরুরি।

মানবকণ্ঠ/ডিআর