‘সকালে ঘুম থেকে উঠেই ৪ কিলোমিটার দূরের একটি সরকারি পুকুর হতে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। প্রতিদিন ২-৩ বার পানি আনতে গিয়ে দিনের অন্য কাজ করতে সমস্যা হয়।’ এসব কথা বলছিলেন কয়রা উপজেলা প্রত্যন্ত জনপদ ৬নং কয়রা গ্রামের উপজাতি নারী বাসন্তী মুন্ডা। এমন সমস্যা কয়রা উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকার। তাদের পুকুরের পানিই একমাত্র ভরসা।
নদীবেষ্টিত এ জনপদের চারিদিকে পানির সমাহার থাকলেও নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা। শুকনো মৌসুম এলেই দেখা দেয় খাবার পানির সংকট। পুকুরগুলো খাবার পানির একমাত্র অবলম্বন থাকলেও অনেক পুকুরে শুকিয়ে যাওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে মানুষদের। কিছু অংশে গভীর নলকূপের পানি পান করলেও পানির আধার স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হচ্ছে ওই এলাকার বাসিন্দাদের।
লবণাক্ত নদী, ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতচিহ্ন আর জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘ ছায়া এই বাস্তবতার মাঝেই দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জনপদ কয়রা উপজেলা আজ তীব্র সুপেয় পানির সংকটে হাঁসফাঁস করছে। উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে পাঁচটিতে কার্যকর সুপেয় পানির কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই; বাকি দুই ইউনিয়নেও রয়েছে মারাত্মক ঘাটতি। ফলে প্রতিদিনের খাবার পানির চাহিদা মেটাতে লড়াই করতে হচ্ছে প্রায় দুই লাখ মানুষকে।
২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, খুলনার কয়রা উপজেলার মোট জনসংখ্যা ২ লাখ ২০ হাজার ১০২ জন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও কম নয়। ১৪১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪টি কলেজ, ৩৮টি হাইস্কুল, ২টি কামিল মাদ্রাসা, ৪টি আলিম মাদ্রাসা ও ২১টি দাখিল মাদ্রাসা রয়েছে। কিন্তু এত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঝেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, উপজেলার আমাদী, বাগালি ও মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের কিছু অংশে পানির সংকট সবচেয়ে তীব্র। এসব ইউনিয়নে অধিকাংশ নলকূপ অকার্যকর; কোথাও নলকূপ নেই বললেই চলে। এ ছাড়া কয়রা সদর ও মহারাজপুর ইউনিয়নের অনেক এলাকাতেও একই চিত্র। কিছু জায়গায় ডিপ টিউবওয়েল থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লবণাক্ত পানি উঠছে। ফলে খাওয়ার উপযোগী পানি হিসেবে অনেকেই পুকুরের পানির ওপর নির্ভর করছেন, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
স্থানীয়রা বলছেন, সব মিলিয়ে কয়রার অধিকাংশ মানুষ সুপেয় পানির সংকটে ভুগছেন। মিঠাপানির অভাবে গৃহপালিত পশু পালনও ছেড়ে দিচ্ছেন অনেকে। আমাদী ইউনিয়নের বামনডাঙ্গা গ্রামে দেখা গেছে একমাত্র মিঠা পানির টিউবওয়েল ঘিরে দীর্ঘ লাইন।
বামনডাঙ্গা, দশবাড়িয়া, খেওনা, খিরোল, বালিয়াডাঙ্গা ও পাটুরিয়া- এই ছয় গ্রামের শত শত পরিবার বিকাল হলেই কলস হাতে ভিড় করেন। একটি কলস পানি তুলতে সময় লাগে পাঁচ থেকে দশ মিনিট। গরমের সময় পানির স্তর নেমে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে খালি হাতে ফেরে।




Comments