Image description

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পৌরসভায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পটি ১৮ বছরেও চালু হয়নি। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় প্রকল্পের অবকাঠামো ও সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না পৌরবাসী।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পৌর এলাকায় পাঁচটি পাম্প হাউস নির্মাণ এবং ২১ দশমিক ১৭৩ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল পৌরবাসীর ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার প্রায় ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত প্রকল্পটি কার্যকরভাবে চালু করা হয়নি।

এদিকে পানি সরবরাহের জন্য পৌরসভা এক হাজার পানির মিটার ক্রয় করে। একই সঙ্গে ৩০০টি বাড়িতে মিটার সংযোগ দেওয়ার কথা বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে প্রায় ৯ লাখ টাকারও বেশি আদায় করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনেও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় মিটারগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পটি এখন কার্যত অচল। একদিকে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে, অন্যদিকে পৌরবাসী বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। একই সঙ্গে নাগরিকদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ এবং ক্রয় করা সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে অপচয় ও অনিয়মের প্রশ্ন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ‘পৌরসভা অ্যান্ড গ্রোথ সেন্টার ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল স্যানিটেশন’ প্রকল্পের আওতায় পৌরবাসীর ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য ২০০৮ সালে পৌর সদর এলাকার প্রথম দফায় উপজেলা চত্বর ও দারিয়াপুর মহল্লায় এবং দ্বিতীয় দফায় শক্তিপুর, রূপপুর ও প্রার্থনাপুর মহল্লায় মোট পাঁচটি পাম্প হাউস নির্মাণ করা হয়।

পাম্প হাউস, বৈদ্যুতিক লাইন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজের জন্য প্রায় ১ কোটি ৪৮ লাখ ২০ হাজার ৮৫৫ টাকা এবং ২১ দশমিক ১৭৩ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের জন্য ২ কোটি ২০ লাখ ২ হাজার ৩৮২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এতে প্রকল্পটির মোট ব্যয় হয় প্রায় ৩ কোটি ৬৮ লাখ ২৩ হাজার ২৩৭ টাকা। শর্ত অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর তৎকালীন শাহজাদপুর পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র মো. নাসির উদ্দিন বুঝে নিয়ে প্রকল্পটি সম্পন্ন হয়েছে মর্মে প্রত্যয়ন দেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী রিপন মিয়া জানান, পাম্প হাউস ও পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ হওয়ার পর সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে তা পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে হস্তান্তরের পর বর্তমানে পাম্প হাউস ও পাইপলাইনগুলো কী অবস্থায় আছে, তা বলা কঠিন।

তিনি আরও বলেন, পৌরবাসীর আয়রনমুক্ত সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে পৌর কর্তৃপক্ষের পাম্প হাউস ও পাইপলাইনগুলো দ্রুত মেরামত ও সংস্কার করে পানি সরবরাহ প্রকল্পটি চালু করা জরুরি।

এদিকে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, পাঁচটি পাম্প হাউসের দরজায় তালা ঝুলছে। পাম্পগুলোতে মরিচা ধরেছে। প্রায় সব পাম্প হাউসই ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় পুরো স্থাপনাগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে যেসব বাড়িতে পানির মিটার লাগানো হয়েছিল, সেসব মিটারেও মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে গেছে। পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের অনেক বাসিন্দা নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে পানির মিটারের জন্য আবেদন করেছিলেন বলেও জানা গেছে। কিন্তু পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় তাদের সেই আবেদন ও অর্থ ব্যয়ের কোনো সুফল মেলেনি।

এ বিষয়ে পৌর সদরের রাঘববাড়ী মহল্লার বাসিন্দা, স্থানীয় সাংবাদিক ওমর ফারুক বলেন, আয়রনমুক্ত বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মেটাতে পৌর এলাকার বিভিন্ন কল-কারখানা, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, গো-খামার ও তাঁত কারখানায় শত শত সাবমার্সিবল পানির পাম্প বসানো হয়েছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে।

তিনি দ্রুত পাম্পগুলো চালু করে পৌরবাসীর জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে শাহজাদপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশীদ জানান, পাইপলাইনে ত্রুটি ধরা পড়ায় কয়েক দফা চেষ্টা করেও পানি সরবরাহের পাম্প চালু করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাম্পগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে পানির পাইপলাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি আরও জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছে। আর্থিক বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রকল্পটি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা শারমিন প্রতিবেদকের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, খুব দ্রুত ওয়ার্ডভিত্তিক পানি সরবরাহের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এসএ