পরশুরামে ১৭ বছরেও সংস্কার হয়নি মুহুরী নদীর বেড়িবাঁধের কাঁচা সড়ক
দুর্ভোগে ৫ হাজার মানুষ
একদিকে নদী, অন্যদিকে বিস্তীর্ণ জনপদ। মাঝখানে মুহুরী নদীর বেড়িবাঁধের ওপর প্রায় তিন কিলোমিটার কাঁচা সড়ক। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে সংস্কারের অভাবে সড়কটি এখন পরিণত হয়েছে দুর্ভোগের স্থায়ী কারণ। বর্ষা এলেই কাদা-পানি আর ভাঙনে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে পুরো সড়ক। এতে ফেনীর পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের উত্তর কাউতলী, ফকিরের খিল ও নিজ কালিকাপুর এলাকার প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উত্তর কাউতলী থেকে ফকিরের খিল হয়ে নিজ কালিকাপুর পর্যন্ত মুহুরী নদীর বেড়িবাঁধের ওপর প্রায় তিন কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। প্রায় ১৭ বছর আগে মাটি দিয়ে ভরাট ও সংস্কার করা হয়েছিল সড়কটি। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি। ফলে সড়কের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। কোথাও কোথাও মাটি সরে গিয়ে রাস্তা ভেঙে পড়েছে।
বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বৃষ্টির পানি ও নদীর পানির চাপে কাঁচা সড়কের বিভিন্ন অংশ নরম হয়ে যায়। যানবাহন তো দূরের কথা, অনেক সময় হেঁটেও চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জরুরি প্রয়োজনে রোগী, শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হয়।
২০২৪ সালের বন্যায় বেড়েছে ক্ষত
২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় সড়কটির বিভিন্ন অংশ নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেড়িবাঁধের বিভিন্ন স্থানে ফাটল সৃষ্টি ও মাটি ধসে পড়ায় যোগাযোগব্যবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়ে। এরপর স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে বস্তা, বাঁশ ও মাটি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কোনো রকমে মেরামত করে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন।
ফকিরের খিল এলাকার বাসিন্দা আবদুল মালেক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই রাস্তা সংস্কার না হওয়ায় এলাকার মানুষ কষ্ট করে চলাচল করছেন। বর্ষা এলে দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। স্থানীয়ভাবে যতটুকু সম্ভব রাস্তা ঠিক রাখা হয়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
উত্তর কাউতলীর বাসিন্দা আবু তাহের বলেন, এই সড়ক দিয়ে এলাকার মানুষ প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে যাতায়াত করেন। কিন্তু রাস্তার অবস্থা খারাপ হওয়ায় বিশেষ করে বর্ষাকালে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। দ্রুত মাটি ভরাট ও টেকসই সংস্কারের দাবি জানান তিনি।
একই এলাকার মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের বন্যার পর রাস্তার বেশ কিছু অংশ ভেঙে যায়। স্থানীয়রা বাঁশ ও বস্তা দিয়ে সেগুলো সাময়িকভাবে মেরামত করেছেন। তবে এভাবে আর কতদিন চলবে—এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
ওমর ফারুক বলেন, রাস্তার দুরবস্থার কারণে কৃষিপণ্য পরিবহনেও সমস্যা হচ্ছে। বর্ষার সময় কাঁচা রাস্তায় যানবাহন চলাচল করতে না পারায় অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভোগান্তি ও খরচ বহন করতে হয়।
আরেক বাসিন্দা ওয়াসিম বলেন, বছরের পর বছর ধরে সড়কটির সংস্কারের দাবি জানানো হলেও স্থায়ীভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মানুষের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত সড়কটি সংস্কারের পাশাপাশি বেড়িবাঁধের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
শুধু রাস্তা নয়, ঝুঁকিতে বেড়িবাঁধও
স্থানীয়দের ভাষ্য, সড়কটি কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি মুহুরী নদীর বেড়িবাঁধের অংশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রাস্তার মাটি সরে যাওয়া কিংবা বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়া ভবিষ্যতে নদীর পানি বাড়লে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু গর্তে মাটি ফেলে সাময়িক সংস্কার না করে মুহুরী নদীর তীর ও বেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে মাটি ভরাট, সড়ক উঁচু ও টেকসইকরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে বর্ষার আগে জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সংস্কার করা হলে মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় এখন সামান্য মেরামতের পরিবর্তে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পাঁচ হাজার মানুষের দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ কবে শেষ হবে—এখন সেটিই স্থানীয়দের প্রশ্ন।
এসএ




Comments