Image description

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় ঝাড়-ফুঁয়ের মাধ্যমে হাম, যক্ষ্মা, বন্ধ্যাত্বসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা দেওয়ার দাবি করছেন শফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। তবে তার বিরুদ্ধে চিকিৎসার নামে প্রতারণা এবং রোগীদের কাছ থেকে কৌশলে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ বিষয়ে সতর্ক করার পরও বন্ধ হয়নি তার কার্যক্রম।

শফিকুল ইসলাম নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের ডাকনীরপাঠ এলাকার কোঁচপাড়া গ্রামের মৃত হুজুর আলীর ছেলে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঝাড়-ফুঁয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ফি না নিলেও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা নেওয়া হয়। এমনকি লাখ টাকার চুক্তিতে বশীকরণ এবং রোগীর নাম শুনেই বিভিন্ন গোপন রোগের চিকিৎসা দেওয়ার দাবি করেন তিনি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ না করেও শফিকুল নিজেকে আধ্যাত্মিক চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। কয়েক মাস আগেও তিনি মানুষের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করতেন এবং কখনো ফেরি করে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতেন। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে তার আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে বলে দাবি স্থানীয়দের। ঝাড়-ফুঁয়ের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থে বাড়ি নির্মাণ, খাদেম সামিউলকে দিয়ে খামার পরিচালনা এবং কৃষিজমি কেনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তারা।

সরেজমিনে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের ভিড় রয়েছে। বাড়ির বাইরে তার কয়েকজন সহযোগী রোগীদের সমস্যার কথা শুনে সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছেন। এ সময় লুঙ্গি ও টি-শার্ট পরিহিত শফিকুলকে একের পর এক সিগারেট পান করতে দেখা যায়। পাশে বসা অনুসারীদের তিনি কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন। সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীদের ঝাড়-ফুঁক দিচ্ছিলেন তিনি। চিকিৎসা শেষে অনেকে টাকা রেখে চলে যাচ্ছিলেন। এদিকে তার খাদেম সামিউলকে কাউকে টাকার বিনিময়ে পানি পড়া বা তেল পড়ার শিশি দিতে দেখা যায়। আবার কাউকে দেওয়া হচ্ছিল অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ।

ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বড়াইবাড়ি থেকে চিকিৎসা নিতে আসা ফজিলা বেগম বলেন, “দাম্পত্য কলহের সমস্যা নিয়ে এ পর্যন্ত পাঁচবার এসেছি। অনেক টাকাও দিয়েছি, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। আজ আবারও টাকা দাবি করছে।”

সন্তান ধারণের আশায় চিকিৎসা নিতে আসা আরেক নারী অভিযোগ করে বলেন, “তিন মাস ধরে আসছি। চাহিদামতো টাকাও দিয়েছি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, শফিকুলের এই কর্মকাণ্ডে চার-পাঁচজন দালাল সক্রিয় রয়েছেন। তারা গ্রামের সহজ-সরল নারীদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে সেখানে নিয়ে আসেন। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করেই তিনি এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ তাদের।

কীভাবে আধ্যাত্মিক সাধক হলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, স্বপ্নে তিনি দীক্ষা পেয়েছেন এবং তার শরীরে আধ্যাত্মিক কিছু ভর করে। এমনকি রোগের সঙ্গে কথা বলতে পারেন বলেও দাবি করেন তিনি।

এ বিষয়ে ভিতরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফি বলেন, “সে শতভাগ বাটপার ও প্রতারক। আগে ভাত পেত না, এখন জায়গা-জমি কিনে নতুন ঘরবাড়ি করছে। গ্রাম পুলিশ পাঠিয়ে সতর্ক করেছি, কিন্তু সে থামছে না।”

নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুজন সাহা বলেন, “নিবন্ধন ছাড়া এসব রোগের চিকিৎসা দেওয়ার এখতিয়ার কারও নেই। এটি প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। এসব প্রতারণার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

গুরুতর রোগের চিকিৎসার নামে ঝাড়-ফুঁক, অর্থ লেনদেন এবং রোগীদের প্রলোভিত করার এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

এসএ