Image description

আপনার ছেলে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে আটক হয়েছে। মামলা হলে ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে। অচেনা নম্বর থেকে এমন ফোন। ওপাশে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিতে শোনানো হচ্ছে পুলিশের ওয়্যারলেস, গাড়ির সাইরেন কিংবা সন্তানের কান্নার শব্দ। এরপর মামলা থেকে সন্তানকে বাঁচাতে দ্রুত বিকাশ বা নগদে টাকা পাঠানোর চাপ।

রাজশাহীর চারঘাটে এমন অভিনব কৌশলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের টার্গেট করে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। গত এক মাসে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও বিত্তশালী পরিবারের দেড় শতাধিক অভিভাবককে ফোন করেছে চক্রটি। তাঁদের মধ্যে অর্ধশতাধিক অভিভাবক টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে জানা গেছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই পুলিশের কাছে।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে আশকরপুর এলাকার ব্যবসায়ী মনিরুজ্জামানের মোবাইল ফোনে অচেনা নম্বর থেকে কল আসে। ফোন ধরে তিনি জানতে পারেন, তাঁর দশম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলেকে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে আটক করা হয়েছে। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য ফোনের ওপাশ থেকে শোনানো হয় সন্তানের কান্নার শব্দ।

ছেলেকে ছাড়াতে প্রথমে ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। আকস্মিক ঘটনায় ঘাবড়ে গিয়ে মনিরুজ্জামান ২০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন। কিন্তু তাতেও থামেনি প্রতারকরা। সাংবাদিকদের দেওয়ার কথা বলে আরও ২০ হাজার টাকা দাবি করা হলে সন্দেহ হয় তাঁর। পরে আত্মীয়স্বজনের সাথে কথা বলে তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, তাঁর ছেলে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেই রয়েছে। তখনই বুঝতে পারেন, প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়েছেন তিনি। এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার চারঘাট থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মনিরুজ্জামান।

ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের বাছাই করে ফোন করছে চক্রটি। ফোন করে প্রথমেই বলা হচ্ছে, তাঁদের সন্তান মাদকদ্রব্যসহ আটক হয়েছে। কখনও পুলিশ, আবার কখনও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে মামলা, আদালত ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার ভয় দেখানো হচ্ছে। এরপর বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিতে শোনানো হচ্ছে পুলিশের ওয়্যারলেসের শব্দ, গাড়ির সাইরেন কিংবা সন্তানের কান্নার মতো কণ্ঠ।

একপর্যায়ে মামলা থেকে সন্তানকে বাঁচাতে দ্রুত টাকা পাঠানোর জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। টাকা পাঠানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বিকাশ ও নগদ নম্বর।

ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, প্রতারকরা অনেক সময় ফোনে শিক্ষার্থীর নাম, শ্রেণি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম পর্যন্ত বলে দিচ্ছে। ফলে অনেক অভিভাবক প্রথমে ঘটনাটি সত্য বলে ধরে নিচ্ছেন। টাকা পাঠানোর পর সন্তানকে ফোন করে বা বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে তাঁরা বুঝতে পারছেন, পুরো ঘটনাটিই সাজানো।

গত ২৪ আগস্ট দুপুরে উপজেলার পিরোজপুর (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুরাদ আলীর ফোনেও একই ধরনের কল আসে। তাঁকে জানানো হয়, তাঁর কিশোর ছেলেকে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে আটক করা হয়েছে। এরপর সন্তানের কণ্ঠ নকল করে কান্নার আওয়াজ শোনানো হয়। মামলা থেকে ছেলেকে বাঁচাতে দ্রুত ৩০ হাজার টাকা পাঠাতে বলা হয় তাঁকে।

মুরাদ আলী বলেন, আমার ছেলে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে আটক হয়েছে বলার পর ওয়্যারলেস ও পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ শুনে আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই। তারা বলে, কারও সাথে বিষয়টি শেয়ার করলে ছেলের ক্ষতি হবে। ফোন না কাটতেও বলা হয়। ভয়ে বাড়ি থেকে টাকা এনে তাদের দেওয়া নম্বরে ৩০ হাজার টাকা পাঠাই। পরে বাসায় গিয়ে দেখি ছেলে ঘুমাচ্ছে।

এ ঘটনায় তিনিও থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। তবে তাঁর অভিযোগ, অভিযোগ দেওয়ার পর ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ তাঁর সাথে কোনো যোগাযোগ করেনি।

উপজেলার রাওথা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তপু রায়হানের নম্বরেও একই কায়দায় ফোন করা হয়। তাঁকে সন্তানের আটকের কথা জানানো হলে তিনি বাসায় ফোন করে খোঁজ নেন। জানতে পারেন, ছেলে বাসাতেই রয়েছে। পরে তিনি থানায় অভিযোগ করেন।

গত ৩০ আগস্ট উপজেলার বড়বড়িয়া এলাকার হাবিবুর রহমানের কাছ থেকে একই কৌশলে ২৪ হাজার টাকা এবং ২৭ আগস্ট রায়পুর এলাকার আলতাফ হোসেনের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে। প্রতারকরা কীভাবে শিক্ষার্থীর নাম, শ্রেণি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করছে, তার নির্দিষ্ট উৎস এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচার বা কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। ফলে প্রতারকরা একের পর এক নতুন অভিভাবককে টার্গেট করার সুযোগ পাচ্ছে।

চারঘাট উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমাকেও ফোনকল করে একই কায়দায় আমার ছেলের কথা বলে প্রতারণার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে এভাবে কল করা হচ্ছে। অনেক শিক্ষক সম্মানের কথা ভেবে সরল মনে টাকা দিয়ে দিচ্ছেন।

তিনি জানান, প্রতারকদের ব্যবহৃত নম্বরগুলো সংগ্রহ করে থানায় দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ তাঁর।

চারঘাট মডেল থানার (ওসি) মাহাবুবুর রহমান বলেন, পুলিশ ও ডিবির পরিচয়ে অভিভাবকদের ফোন করে টাকা দাবির বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে। প্রতারক চক্রকে শনাক্ত করতে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। তিনি অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এ ধরনের ফোন এলে আতঙ্কিত না হয়ে আগে সন্তানের অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। পরিচয় যাচাই না করে কোনো অবস্থাতেই কাউকে টাকা পাঠানো উচিত নয়।

চারঘাটে একের পর এক এমন ঘটনায় শুধু অর্থ হারানোর ঝুঁকিই নয়, বাড়ছে অভিভাবকদের উদ্বেগও। দ্রুত চক্রটিকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা না গেলে এ ধরনের প্রতারণা আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসএ