সাভারের ট্যানারি স্থানান্তরের ব্যবস্থাপনা ছিল ‘ক্লাসিক কেস অফ মিসম্যানেজমেন্ট’: বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী
বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার মুক্তাদির বলেছেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। তবে পুরো স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অব্যবস্থাপনা হয়েছে, যার কারণে শিল্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।
শুক্রবার দুপুরে বিসিক চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, “এই বিষয়ে আগেও আপনাদের সাথে কথা বলেছি। হাজারীবাগ থেকে সাবারে ট্যানারি গুলো স্থানান্তরটা সিদ্ধান্তটা ঠিক ছিল। কারণ ঠিকমত বর্জ্য পরিশোধনাগরের ব্যবস্থা আছে। এরকম একটা জায়গায় উচ্চমাত্রার বর্জ্য তৈরি হয়। এরকম একটা শিল্প হওয়া উচিত, এমন একটা জায়গায় যেখানে ভালো এফিন ট্রিটমেন্ট প্লান্টের সুবিধা আছে। কিন্তু যেভাবে স্থানান্তর হয়েছে সে ব্যবস্থাপনাটা ছিল একটা ক্লাসিক কেস অফ মিসম্যানেজমেন্ট। যেই কারণে না বর্জ্য পরিশোধনাগারটা যে প্রজেক্টেড ক্যাপাসিটি ছিল সেই ক্যাপাসিটিতে ফাংশনাল আছে। আর না যারা এসেছে তারা প্রত্যেকে জীবিত থাকতে পেরেছে। অনেকগুলো শিল্প প্রতিষ্ঠান মাঝপথে মানে হারিয়ে গিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এখন যে জিনিসটার দিকে আমরা দৃষ্টি দিচ্ছি একটা হলো এই বর্জ্য পরিশোধনা আগারটা যে প্রজেক্টেড ক্যাপাসিটি ছিল ২৫ হাজার কিউবিক মিটার পার ডে কি কি পরিবর্তন করলে সেই জায়গাতে আমরা ফেরত আসবো এবং ক্রোমিয়াম রিকভারির জন্য কি করা লাগে সেটা আমরা করব।”
ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, “দুই নাম্বার হচ্ছে স্থানান্তরের সময় হাজারীবাগ থেকে এখানে স্থানান্তরের সময়ে যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান ঝরে গিয়েছে এবং পরবর্তীতে অচল অথবা নিম্নমাত্রায় সচল থাকার কারণে বিপুল পরিমাণ দায় দেনার সম্মুখীন হয়েছে এবং লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে সেইগুলোকে কি উপায়ে আবার লাভ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যায়। যারা আর এই ব্যবসায় সক্ষমতা রাখে না। আগ্রহ আর সক্ষমতা দুইটা দুই জিনিস। আগ্রহ এবং সক্ষমতা যারা হারিয়ে ফেলেছে সেইসব জায়গায় কিভাবে নতুন বিনিয়োগকারীকে আনা যায় এই প্রত্যেকটা জিনিস নিয়ে আমরা কাজ করছি।”
এছাড়াও বেশ কিছুদিন যাবত আলোচনায় থাকা ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্যোগে ইটালিয়ান কোম্পানির এসেসমেন্ট রিপোর্ট অল্প কিছুদিনের মধ্যে হাতে পাওয়ার কথা জানিয়ে মন্ত্রী এসময় বলেন, যারা নিজস্ব ইটিপি স্থাপন করবে তাদের টেকনিক্যাল সাপোর্টসহ, সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনবোধে আর্থিক ও পলিসি সাপোর্ট দেওয়া হবে।
এছাড়াও এই খাতকে পূর্ণমাত্রায় বিকশিত করতে পারলে এটিকে ১০/১২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি খাতে পরিনত করা সম্ভব উল্লেখ করে বর্তমান সরকার এই খাতকে বিপুল বিদেশি মুদ্রা আহরণকারী খাত হিসাবে আবার বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করবে বলেও আশ্বাস দেন মন্ত্রী।
এছাড়াও সরকারের পক্ষ থেকে কোরবানির পশুর লবনযুক্ত চামড়ার দর নির্ধারণ করা হলেও রক্তমাখা কাঁচা চামড়ার আকারভেদে ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ না করায় কোরবানির পর প্রথম দফায় ঢাকা ও এর আশেপাশের জেলা থেকে আসা রক্তমাখা কাঁচা চামড়ার দর নিয়ে আড়ৎ ও ট্যানারি মালিকদের তালবাহানা ও বিক্রেতাদের উপযুক্ত দর প্রদানের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতা এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীসহ মাদ্রাসা ও এতিমখানা থেকে চামড়া নিয়ে আসা বিক্রেতাদের লোকসানের বিষয়টি উল্লেখ করে এবিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ কি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এর পক্ষ থেকে এমন প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রী এটিকে 'পচনশীল' পণ্য হিসাবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ব্যাবসায়ীরা লাভের জন্য ব্যবসা করেন। কাজেই তারা সংরক্ষিত চামড়া কিনবেন, পচা চামড়া তারা তো কিনবেন না। ফলে আমি সকলের প্রতি আহ্বান জানাবো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চামড়ায় লবন মাখিয়ে সেটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া।
তিনি এসময় আরও বলেন, লবন মাখানো চামড়ার মূল্য আছে কিন্তু লবন মাখানো ছাড়া চামড়ার লাইফ নেই, লংজিবিটি নেই, এটা কে নেবে।
পরে মন্ত্রী শিল্পনগরীর বিভিন্ন ট্যানারি কারখানা পরিদর্শন করেন এবং মালিকদের সঙ্গে শিল্পের বর্তমান অবস্থা, উৎপাদন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেন।
এদিকে ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিনেও সাভারের ট্যানারিগুলোতে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে শুক্রবার (২৯ মে) বিকেল ৫টা পর্যন্ত শিল্পনগরীতে এসেছে ৫ লাখ ২ হাজার ৭৯৬টি কাঁচা চামড়া। দ্বিতীয় দিনের কোরবানির পশুর চামড়া সহ সময়ের সাথে সাথে শিল্প নগরীতে আসা এসব চামড়ার সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী কয়েক দিন চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কার্যক্রম আরও বাড়বে।
চামড়া শিল্প নগরীর বিসিক কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাইয়ান জানান, বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা থেকে শুক্রবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৬১৬টি ট্রাকে করে শিল্পনগরীতে এসেছে ৫ লাখ ০২ হাজার ৭৯৬টি কাঁচা চামড়া। এর মধ্যে গরু ও মহিষের চামড়া রয়েছে ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৬৮৯টি এবং ছাগল-ভেড়ার চামড়া ১৬ হাজার ১০৭টি।
উল্লেখ্য, প্রতিবছর কোরবানির ঈদের প্রথম দিন শিল্প নগরীতে প্রবেশ করা চামড়ার প্রায় সিংহভাগই রক্তমাখা কাঁচা চামড়া। কোরবানির পরপর দ্রুত সময়ের মধ্যে এগুলো সংগ্রহ করে বিক্রি করতে নিয়ে আসা এসব চামড়ায় অধিকাংশ সময়েই লবন মাখানো হয়না। এছাড়াও রক্তমাখা এসব চামড়ার পরিমাণও কিন্তু কম নয়।
এছাড়াও গতকাল শিল্প নগরী ও হেমায়েতপুর চামড়া আড়তের উদ্দেশ্যে আসা চামড়া বোঝাই প্রতিটি গাড়ি থেকে স্লিপ দিয়ে এক হাজার টাকা হারে চাদা আদায়ের অভিযোগ এবং সেবিষয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহন না করার প্রশ্নে মন্ত্রী জানান বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দেখবে এবং এবিষয়ে তথ্যপ্রমাণসহ রিপোর্ট প্রকাশ হলে বা অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তর ব্যবস্থা গ্রহন করবে।




Comments