Image description

কিংবদন্তি গায়ক, গিটারিস্ট ও সংগীত পরিচালক আইয়ুব বাচ্চুর ৬৪তম জন্মদিন রোববার (১৬ আগস্ট)। ১৯৬২ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের পটিয়ার এক বনেদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই কালজয়ী শিল্পী। তার পারিবারিক ডাক নাম ছিল রবিন। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি এক দুর্নিবার আকর্ষণ ছিল তার, আর সেই ঝোঁক থেকেই বাবার উপহার দেওয়া প্রথম গিটার হাতে নিয়ে শুরু হয়েছিল এক দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক সুরের যাত্রা।

সংগীতের মাধ্যমে দেশ ও বিদেশের অগুনিত শ্রোতা-দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন এই তারকা। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেও তার সুরের মূর্ছনা আজও অমলিন। বেঁচে থাকলে আজ অসংখ্য ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সহকর্মীদের ভালোবাসায় সিক্ত হতেন তিনি। প্রিয় মানুষদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠত তার প্রিয় ‘এবি কিচেন’ স্টুডিও। তার শারীরিক অনুপস্থিতি অপূরণীয় এক শূন্যতা তৈরি করলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভক্তরা আজ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছেন তাদের প্রিয় ‘বস’কে।

আইয়ুব বাচ্চুর বাবা ইশহাক চৌধুরী এবং মা নুরজাহান বেগম। একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বেড়ে উঠলেও পরিবারের কেউ সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু বাবার দেওয়া গিটারটিই ছিল তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার বড় নিয়ামক। ১৯৭৭ সালে তার পেশাদার সংগীতজীবন শুরু হয় এবং ১৯৭৮ সালে তিনি ব্যান্ড ‘ফিলিংস’-এ যোগ দেন। তার গাওয়া প্রথম গান ছিল ‘হারানো বিকেলের গল্প’। এরপর তিনি যোগ দেন জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘সোলস’-এ, যেখানে ১৯৮০ থেকে পরবর্তী এক দশক যুক্ত থেকে সংগীতে নিজের অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।

সোলস ছাড়ার পর ১৯৯১ সালে আইয়ুব বাচ্চু নিজের নেতৃত্বে গঠন করেন ব্যান্ড ‘এলআরবি’। শুরুতে এর পূর্ণ অর্থ ছিল ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’, কিন্তু একই নামে অস্ট্রেলিয়ায় একটি ব্যান্ড থাকায় পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’। দীর্ঘ সংগীত ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। ১৯৯৯ সালে ‘লাল বাদশা’ ও ‘আম্মাজান’, ২০০০ সালে ‘গুন্ডা নাম্বার ওয়ান’, ২০০৪ সালে ‘ব্যাচেলর’ ও ‘রং নাম্বার’, ২০০৯ সালে ‘চাঁদের মতো বউ’, ২০১২ সালে ‘চোরাবালি’, ২০১৩ সালে ‘টেলিভিশন’ এবং ২০১৪ সালে ‘এক কাপ চা’ ছবিতে তার গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে ‘আম্মাজান’ গানটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সেরা জনপ্রিয় গান হিসেবে স্বীকৃত।

সুরের এই জাদুকরের প্রথম একক অ্যালবাম ‘রক্তগোলাপ’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। এলআরবির হয়ে তার প্রথম অ্যালবাম ‘এলআরবি’ (১৯৯২) থেকে শুরু করে ‘ব্যান্ডের সুখ’ (১৯৯৩), ‘তবুও’ (১৯৯৪), ‘ঘুমন্ত শহরে’ (১৯৯৫), ‘ফেরারী মন’, ‘স্বপ্ন’ (১৯৯৬), ‘আমাদের বিস্ময়’ (১৯৯৮), ‘মন চাইলে মন পাবে’ (২০০০), ‘অচেনা জীবন’ (২০০৩), ‘মনে আছে নাকি নেই’ (২০০৫), ‘স্পর্শ’ (২০০৮), এবং ‘যুদ্ধ’ (২০১২) সংগীত জগতে অমর হয়ে আছে।

একক অ্যালবাম হিসেবে তার জনপ্রিয় আরও কিছু কাজ হলো ‘ময়না’ (১৯৮৮), ‘কষ্ট’ (১৯৯৫), ‘সময়’ (১৯ forums), ‘একা’ (১৯৯৯), ‘প্রেম তুমি কি!’ (২০০২), ‘দুটি মন’, ‘কাফেলা’, ‘প্রেম প্রেমের মতো’ (২০০৩), ‘পথের গান’ (২০০৪), ‘ভাটির টানে মাটির গানে’ (২০০৬), ‘জীবন’, ‘সাউন্ড অব সাইলেন্স’ (ইন্সট্রুমেন্টাল, ২০০৭), ‘রিমঝিম বৃষ্টি’ (২০০৮), ‘বলিনি কখনো’ (২০০৯) এবং ‘জীবনের গল্প’ (২০১৫)। এ ছাড়া নব্বইয়ের দশকে ব্যান্ড এলআরবি ও ফিলিংস যৌথভাবে ‘ক্যাপসুল’ ও ‘স্ক্রু ড্রাইভার’ নামে দুটি অত্যন্ত জনপ্রিয় মিশ্র অ্যালবাম উপহার দিয়েছিল।

আজকের এই দিনে ভক্তদের হৃদয়ে একটাই সুর ধ্বনিত হচ্ছে— ‘তুমিহীন এই জীবনে কিছুই যে নেই আর...’। আইয়ুব বাচ্চু তার অসামান্য সৃষ্টির মাধ্যমেই বেঁচে থাকবেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

ডিআর