Image description

একটা সময় ছিল, চিঠি আসার শব্দও শোনা যেত। দরজার বাইরে ডাকপিয়নের কণ্ঠ, সাইকেলের ঘণ্টা কিংবা হাতে ধরা একটি খাম এই সামান্য দৃশ্যই একটি পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়ে দিতে পারত। দূরের মানুষটি কেমন আছে, মা-বাবা ভালো আছেন কি না, ভাই-বোনেরা কী করছে, প্রিয় মানুষটি এখনো মনে রেখেছে কি না এসব প্রশ্নের উত্তর আসত কয়েক পাতার কাগজে। উত্তর আসতে সময় লাগত, কিন্তু সেই অপেক্ষার প্রতিটি দিন ছিল ভালোবাসায় ভরা।

আজ ১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব চিঠি দিবস। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, মেসেঞ্জার, ই-মেইল আর ভিডিও কলের ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দিনটি যেন আমাদের ফিরিয়ে নেয় এমন এক সময়ে, যখন যোগাযোগ মানেই ছিল অপেক্ষা। একটি চিঠি লিখে ডাকবাক্সে ফেলে দেওয়ার পর মানুষ জানত না ঠিক কবে উত্তর আসবে। তবু প্রতিদিন দরজার দিকে তাকানো হতো। ডাকপিয়নের পায়ের শব্দ কানে এলেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উত্তেজনা তৈরি হতো। হয়তো আজ চিঠি এসেছে।

হেলাল হাফিজের ‘পত্র দিয়ো’ কবিতার সেই আকুতিই যেন এই হারিয়ে যাওয়া সময়ের সবচেয়ে নিখুঁত প্রতিচ্ছবি “এখন তুমি কোথায় আছো কেমন আছো, পত্র দিয়ো।” একটি চিঠির জন্য এমন আকুলতা আজকের দ্রুতগতির জীবনে কল্পনা করাও কঠিন। অথচ একসময় এই ‘পত্র দিয়ো’ই ছিল দূরের মানুষের কাছে পৌঁছানোর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ডাক।

পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব জাহিদুল করিমের কাছে সেই সময় এখনো যেন খুব বেশি দূরের নয়। তাঁর গ্রামের বাড়ি বরিশালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ঢাকায় থাকলেও মা-বাবা, ভাই-বোনেরা তখন ছিলেন গ্রামের বাড়িতে। আজকের মতো মুঠোফোনে মুহূর্তেই কথা বলার সুযোগ ছিল না। ফলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান অবলম্বন ছিল চিঠি।

জাহিদুল করিমের স্মৃতিতে সেই দিনগুলো মানেই কাগজ কলম, খাম, ডাকটিকিট আর অপেক্ষা। তিনি বলেন, "সেই দিনগুলো মনে পড়লে এখনো কাগজ-কলমের কথা মনে পড়ে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল চিঠি। মা-বাবা, ভাই-বোনের কাছে চিঠি লিখে ডাকপিয়নের অপেক্ষায় থাকতাম। একটি চিঠি হাতে পাওয়ার আনন্দই ছিল অন্যরকম। চিঠির প্রতিটি শব্দে যেন আপনজনের ভালোবাসা, অপেক্ষা আর আবেগ মিশে থাকত। এখন মোবাইল ফোনে মুহূর্তেই কথা বলা যায়, কিন্তু চিঠির সেই অনুভূতি, অপেক্ষা আর স্মৃতির জায়গাটা আর কোনো মাধ্যম পূরণ করতে পারে না।"

ধানমন্ডির বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী লতিফুল ইসলামের গল্পও অনেকটা একই রকম। তাঁর গ্রামের বাড়ি রাজশাহী। ঢাকা কলেজে পড়াশোনার সময় পরিবার থেকে দূরে ঢাকায় থাকতে হয়েছে তাঁকে। তখন যোগাযোগের সহজ মাধ্যম ছিল না। ফলে পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল চিঠি।

রাজশাহীর বাড়ি থেকে ঢাকায় আসা একটি চিঠি তখন শুধু খবর বহন করত না; বহন করত বাড়ির গন্ধ। চিঠির পাতায় থাকত মা-বাবার খবর, পরিবারের কথা, গ্রামের পরিচিত মানুষদের কথা, কখনো পড়াশোনার খোঁজ, কখনো প্রয়োজনীয় নির্দেশনা। আর ঢাকা থেকে লেখা চিঠিতে থাকত নিজের খবর, পড়াশোনার কথা, শহরের অভিজ্ঞতা।

লতিফুল ইসলাম বলেন, "চিঠির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি জড়িয়ে ছিল, তা হলো অপেক্ষা। একটি চিঠি লেখার পর সেটি ডাকযোগে পৌঁছাতে সময় লাগত, আবার প্রিয়জনের উত্তর আসত আরও পরে। সেই অপেক্ষার প্রতিটি দিন কেমন যেন আলাদা ছিল। ডাকপিয়ন এলেই মনে হতো, হয়তো আজ আমার চিঠি এসেছে। কখনো কয়েক দিন, কখনো আরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হতো। তাই একটি চিঠি হাতে পাওয়ার মুহূর্তটি ছিল সত্যিই আনন্দের।"

তিনি বলেন, "চিঠি খুলে পড়ার মধ্যেও আলাদা একটা অনুভূতি ছিল। প্রিয়জনের হাতের লেখা দেখলেই মনে হতো, মানুষটি যেন দূরে থেকেও আমার খুব কাছে আছে। চিঠির প্রতিটি শব্দ বারবার পড়তাম। কখনো পুরোনো চিঠি যত্ন করে রেখে দিতাম, সুযোগ পেলেই আবার পড়তাম। এখন মোবাইল ফোনে মুহূর্তেই যোগাযোগ করা যায়, উত্তর পেতেও অপেক্ষা করতে হয় না। কিন্তু সেই অপেক্ষার মধ্যে যে আবেগ, উৎকণ্ঠা আর ভালোবাসা ছিল, সেটিই চিঠিকে আমাদের কাছে এত বিশেষ করে তুলেছিল। এখন মনে হয়, চিঠির যুগ শুধু যোগাযোগের একটি মাধ্যম ছিল না; এটি ছিল মানুষের অনুভূতিকে ধরে রাখারও একটি সুন্দর সময়।"

একটি চিঠির জীবনও ছিল অদ্ভুত। লেখকের টেবিল থেকে সেটি প্রথমে খামে ঢুকত। খামের ওপর লেখা হতো প্রাপকের নাম ও ঠিকানা। তারপর ডাকটিকিট লাগিয়ে সেটি দেওয়া হতো ডাকঘরে। সেখান থেকে শুরু হতো চিঠির দীর্ঘ যাত্রা। বাছাই, পরিবহন, স্থানীয় ডাকঘর সবশেষে কোনো এক সকালে বা দুপুরে ডাকপিয়নের ব্যাগে উঠে সেটি পৌঁছাত প্রাপকের বাড়িতে।

ঢাকার জিগাতলা পোস্ট অফিসের পোস্টাল অপারেটর মামুনুর রশিদের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাতেও ডাকব্যবস্থার এই পরিবর্তনের ছবি ধরা পড়ে। তিনি বলেন, "একসময় ব্যক্তিগত চিঠি ডাকঘরের নিয়মিত যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সেই প্রবাহ অনেকটাই কমেছে। এখন মানুষ দ্রুত যোগাযোগের জন্য মোবাইল ফোন ও অনলাইন মাধ্যমের ওপর নির্ভর করে। ডাকব্যবস্থায় ব্যক্তিগত চিঠির জায়গা অনেকটাই বদলে গেছে। তবু ডাকঘরের কাউন্টার, পুরোনো খাম, ডাকটিকিট কিংবা ঠিকানা লেখা কোনো চিঠি দেখলে সেই সময়ের স্মৃতি ফিরে আসে। কারণ ডাকঘর শুধু কাগজ আদান-প্রদানের জায়গা ছিল না; এটি ছিল মানুষের সম্পর্কের একটি সেতু। তবে আজ আমাদের এখানে আশা দুটি ব্যক্তিগত খাম দেখে মনে হয়েছে সেগুলো লাভ লেটার"

আর সেই সেতুর সবচেয়ে পরিচিত মুখ ছিলেন ডাকপিয়ন।

ডাকপিয়ন রফিকুল ইসলামের মতো মানুষের হাত ধরে প্রতিদিন অসংখ্য চিঠি পৌঁছে যেত মানুষের ঘরে। একটি ব্যাগে হয়তো থাকত কয়েক ডজন চিঠি, কিন্তু প্রতিটি চিঠির পেছনে ছিল আলাদা গল্প। কোনোটি সন্তানের লেখা, কোনোটি মা-বাবার, কোনোটি বন্ধুর, কোনোটি প্রিয় মানুষের।

তিনি বলেন, "একজন ডাকপিয়নের কাছে তাই প্রতিটি বাড়ি ছিল শুধু একটি ঠিকানা নয়। প্রতিটি খাম ছিল একটি পরিবারের প্রতীক্ষা। দূর থেকে ডাকপিয়নকে দেখা মাত্র অনেক পরিবার বুঝে যেত আজ হয়তো খবর এসেছে। কারও ছেলে শহরে, কারও স্বামী অন্য জেলায় চাকরি করছেন, কারও সন্তান বিদেশে। একটি চিঠি তাঁদের দূরত্বকে সাময়িকভাবে ছোট করে দিত। তাদের চোখে প্রাপ্তির শান্তি দেখে আমাদের ভালো লাগতো‌ তবে

ডিআর