১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস
৭০০ টাকার ভাতায় গাইবান্ধায় নিঃসঙ্গ জীবনযুদ্ধ, বৃদ্ধাশ্রমই শেষ ভরসা
ক্রমক্ষয়িষ্ণু পারিবারিক বন্ধন, দারিদ্র্য, নদীভাঙন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চাপে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে গাইবান্ধার বহু প্রবীণের সম্বল বলতে এখন সামান্য সরকারি ভাতা আর অনিশ্চিত আশ্রয়। সন্তান-স্বজনের অবহেলা, চিকিৎসার ব্যয় ও কর্মক্ষমতা হারানোর বাস্তবতায় অনেকের শেষ ঠিকানা হয়ে উঠছে বৃদ্ধাশ্রম।
প্রতি বছর ১ অক্টোবর সারা বিশ্বে পালিত হয় আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। দিবসটি ঘিরে প্রবীণদের মর্যাদা, নিরাপত্তা, অধিকার ও যত্ন নিশ্চিত করার নানা অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়। কিন্তু গাইবান্ধার প্রত্যন্ত চর ও গ্রামাঞ্চলে গেলে সেই অঙ্গীকার আর বাস্তবতার মধ্যে থাকা বিস্তর ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নদীভাঙন, দারিদ্র্য এবং ভেঙে পড়া পারিবারিক বন্ধনের চাপে জেলার হাজার হাজার প্রবীণ মানুষ কাটাচ্ছেন অনিশ্চিত জীবন। তাদের অনেকের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন মাসিক ৭০০ টাকার সরকারি বয়স্ক ভাতা। এই সামান্য অর্থ দিয়েই কাউকে ওষুধ কিনতে হয়, কাউকে খাবার জোগাড় করতে হয়, আবার কাউকে নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য খরচ মেটাতে হয়।
২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী গাইবান্ধা জেলার মোট জনসংখ্যা ২৫ লাখ ৬২ হাজার ২৩৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১২ লাখ ৪১ হাজার ১৪৫, নারী ১৩ লাখ ২০ হাজার ৯৬৭ এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ১৫৩ জন।
একই শুমারিতে জাতীয়ভাবে মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশকে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতীয় গড় অনুপাত গাইবান্ধার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে জেলায় প্রবীণের সংখ্যা আনুমানিক ২ লাখ ৩৭ হাজার থেকে ২ লাখ ৩৮ হাজারের কাছাকাছি দাঁড়ায়। অর্থাৎ জেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় প্রতি ১০ জনে একজন প্রবীণ বয়সে পৌঁছেছেন। এদের একটি বড় অংশই নিরাপত্তাহীনতা ও নানা সামাজিক সংকটের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ প্রবীণ নাগরিক রয়েছেন। ২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা সাড়ে ৪ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। বিপুল এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ পেনশন সুবিধা পান। বাকিদের অনেকেই নিজেদের সঞ্চয় কিংবা সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক জরিপে বলা হয়েছে, গ্রামবাংলার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রবীণ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করেন। জাতীয়ভাবে প্রায় ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশ প্রবীণের নিজস্ব কোনো আয়ের উৎস নেই। প্রায় ৪১ দশমিক ৬৭ শতাংশ পরিবারে প্রবীণরা উপেক্ষা বা অবহেলার শিকার এবং মোট প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ১০ শতাংশ ভবঘুরে বা বাস্তুচ্যুত জীবনযাপন করছেন।
সরকার বর্তমানে দেশের ৬২ লাখ প্রবীণকে মাসে ৭০০ টাকা করে বয়স্ক ভাতা দিচ্ছে। তিন মাস পরপর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২ হাজার ১০০ টাকা করে দেওয়া হয়। এ খাতে বাজেটে ৫ হাজার ২৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
গাইবান্ধার গ্রামীণ এলাকায় এই সামান্য অর্থই অনেক প্রবীণের ওষুধ ও মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর একমাত্র অবলম্বন। কয়েক বছর আগেও ভাতার পরিমাণ ছিল মাসে ৫০০ টাকা। বাজারমূল্য ও চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় সেই অর্থ ছিল অত্যন্ত অপ্রতুল। ভাতা বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হলেও প্রবীণদের জীবনযাত্রার সংকট খুব একটা কমেনি।
এই সামান্য ভাতার অর্থকে কেন্দ্র করেও কখনো কখনো ভয়াবহ অপরাধের ঘটনা ঘটছে। ২০২৪ সালের মার্চে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। বয়স্ক ভাতার টাকা ও সিম কার্ড হাতিয়ে নিতে প্রতিমা বালার (৬০) মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী তাঁর ১১ বছর বয়সী নাতি জিৎচন্দ্র বাদ্যকরকে হত্যা করা হয়। স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী জিৎচন্দ্রের মরদেহ নদীতীরবর্তী একটি ভুট্টাক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, চরম দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কীভাবে প্রান্তিক পরিবারগুলোর ওপর ভয়াবহ সামাজিক চাপ তৈরি করতে পারে।
প্রবীণদের অধিকার ও পারিবারিক দায়িত্ব নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালে প্রণয়ন করা হয় ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’। আইন অনুযায়ী, সামর্থ্যবান সন্তানের জন্য পিতা-মাতার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও সঙ্গ দেওয়ার বিষয়টি বাধ্যতামূলক। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে সম্পর্ক আরও খারাপ হবে—এমন আশঙ্কা, সন্তানদের প্রতি মমতা, সামাজিক লোকলজ্জা এবং আইনি জটিলতার কারণে অনেক প্রবীণই থানায় বা আদালতে যেতে চান না। ফলে আইনে অধিকার থাকলেও বাস্তবে তার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকেই।
দারিদ্র্য ও যৌথ পরিবারের দ্রুত ভাঙনের কারণে উত্তরাঞ্চলের অনেক প্রবীণ বাবা-মায়ের ঠাঁই হচ্ছে না নিজের পরিবারেই। পরিবারে সন্তানসংখ্যা কমে এক-দুইয়ে নেমে আসা, কর্মসংস্থানের জন্য অভিবাসন, নারীশিক্ষা ও নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে পারিবারিক কাঠামোয় এসেছে বড় পরিবর্তন। সন্তানরা জীবিকার প্রয়োজনে দূরে চলে যাওয়ায় অনেক প্রবীণ মা-বাবা একাকী হয়ে পড়ছেন।
শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, প্রিয়জনের মৃত্যু এবং একক পরিবারের বিস্তারের কারণে সন্তান-নাতি-নাতনিদের সঙ্গ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকে। ফলে বয়সের ভারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে গভীর নিঃসঙ্গতা।
গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী ইউনিয়নের ছোট সোহাগী গ্রামে ২০১৭ সালে স্বেচ্ছাশ্রমে গড়ে তোলা হয় মেহেরুননেছা বৃদ্ধাশ্রম। স্থানীয় তরুণ আপেল মাহমুদ ও তাঁর কয়েকজন সহপাঠী নিজেদের পড়াশোনা ও ব্যবসার খরচ থেকে অর্থ সাশ্রয় করে আশ্রমটি পরিচালনা করছেন।
বর্তমানে সেখানে প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ জন গৃহহীন ও স্বজনদের দ্বারা উপেক্ষিত নারী-পুরুষ আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রমে থাকা প্রবীণদের প্রত্যেকের জীবনকাহিনি যেন পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতার আলাদা আলাদা দলিল।
চক বিরাহিমপুরের ভসি মামুদের বয়স আনুমানিক ১০৩ থেকে ১০৮ বছর। চোখের অস্ত্রোপচারের পর বিশ্রামে থাকার সময় কাজ করতে না পারায় পুত্রবধূর কাছ থেকে অপমানিত হয়ে তিনি বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসেন বলে জানা যায়।
কালিডোবার আশি-ছুঁইছুঁই জবেদ আলীকে ছেলেরা বাড়ি থেকে বের করে দিলে তিনি রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন। পরে আশ্রয় নেন বৃদ্ধাশ্রমে। সেখানেই হারান স্ত্রীকে।
সমসপাড়ার সত্তরোর্ধ্ব আজিজার রহমানের সন্তানরা খোঁজ না নেওয়ায় দীর্ঘদিন তাঁকে ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন কাটাতে হয়েছে। একই গ্রামের ৬০ বছর বয়সী সোনাভান বেওয়ার স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলেরা তাঁর অন্নসংস্থানের দায়িত্ব নেয়নি। অন্যের বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে পা ভেঙে গেলে তিনিও আশ্রয় নেন ওই বৃদ্ধাশ্রমে।
আশ্রমে তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের যত্নে তাঁদের অন্ন-বস্ত্রের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু ঈদ, পূজা কিংবা অন্যান্য উৎসবের দিনগুলোতে সন্তান ও স্বজনদের শূন্যতা তাঁদের কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
গাইবান্ধার বুক চিরে বয়ে যাওয়া তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর অব্যাহত ভাঙন চরাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী প্রবীণদের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
বর্ষায় পানি বাড়া-কমার সঙ্গে হঠাৎ শুরু হওয়া ভাঙনে প্রতিবছর বহু পরিবার ভিটেমাটি হারায়। জীবনের শেষ বয়সে এসে বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়া প্রবীণদের অনেকেরই নতুন করে ঘর তোলার ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম এবং সদর উপজেলার মোল্লারচর ও সিধাইল এলাকায় নদীভাঙনে ফসলি জমির পাশাপাশি হারিয়ে যাচ্ছে বহু মানুষের বসতভিটা। ফলে প্রবীণদের শেষ অবলম্বনটুকুও অনিশ্চিত হয়ে সামর্থ্য থাকে না।
ফুলছড়ি উপজেলার চৌমোহন চর, কাপাসিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম এবং সদর উপজেলার মোল্লারচর ও সিধাইল এলাকায় নদীভাঙনে ফসলি জমির পাশাপাশি হারিয়ে যাচ্ছে বহু মানুষের বসতভিটা। ফলে প্রবীণদের শেষ অবলম্বনটুকুও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
দক্ষিণ রসুলপুর গ্রামের ৫২ বছর বয়সী আফরুজা বেগম এবং উজালডাঙা চরের বৃদ্ধ রোস্তম আলীর অভিজ্ঞতাও একই বাস্তবতার কথা বলে। নদীর আকস্মিক ভ গাইবান্ধার ২৫০ শয্যার হাসপাতাল মাত্র ১০০ শয্যার জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে বার্ধক্যজনিত জটিলতায় আক্রান্ত প্রবীণরা প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত সেবাাঙনে ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার মতো সময়ও অনেক সময় পাওয়া যায় না। বাঁধের ধারে টিনের ঝুপড়ি তুলে আবার শুরু করতে হয় নতুন জীবন।
নদীভাঙন শুধু বসতভিটা কেড়ে নিচ্ছে না, কেড়ে নিচ্ছে জীবিকার পথও। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ায় ঐতিহ্যবাহী গরু-লাঙলনির্ভর চাষাবাদ থেকে ছিটকে পড়েছেন অনেক প্রবীণ কৃষক।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক জটিলতা দেখা দিলেও গাইবান্ধার প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা এখনও অপ্রতুল। গাইবান্ধার ২৫০ শয্যার হাসপাতাল মাত্র ১০০ শয্যার জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে বার্ধক্যজনিত জটিলতায় আক্রান্ত প্রবীণরা প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা হলো বয়স্ক ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসেবা, বার্ধক্যজনিত রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষায়িত শাখা। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকার প্রবীণদের জন্য এ ধরনের সেবা এখনও সহজলভ্য নয়।
আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের প্রতি পাঁচজন প্রবীণের চারজন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ডিমেনশিয়া ও বিষণ্নতার মতো অসংক্রামক রোগে ভুগছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষণা অনুযায়ী, দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রবীণ পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন এবং ৬৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবীণ পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
আয়ের পথ বন্ধ, স্বাস্থ্যসেবা অপ্রতুল, তার ওপর রোগ-শোক ও নিঃসঙ্গতার চাপ—সব মিলিয়ে গাইবান্ধার চরাঞ্চল ও গ্রামীণ প্রবীণ জনগোষ্ঠী এক জটিল মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে তাই শুধু আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা নয়, প্রবীণদের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ বাসস্থান, পর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তা, সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা, পারিবারিক যত্ন এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেন কোনো মানুষকে ৭০০ টাকার ভাতা কিংবা একটি বৃদ্ধাশ্রমের আশ্রয়কে একমাত্র ভরসা হিসেবে বেছে নিতে না হয়—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
এসএ




Comments