Image description

ডিজিটাল যুগে মানুষের অবসর কাটানোর ধরন এবং তথ্য গ্রহণের পদ্ধতিতে এসেছে বিপ্লব। মুঠোফোনের সহজলভ্যতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওর প্লাবনে বদলে গেছে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস। প্রশ্ন উঠেছে—মুঠোফোনের স্ক্রিনে আটকে থাকা এই সময়ে আমরা কি শুধু পড়ার মাধ্যম পাল্টাচ্ছি, নাকি ধীরে ধীরে দীর্ঘ লেখা পড়ার ধৈর্য ও মনোযোগও হারিয়ে ফেলছি?

ভিডিওর ভিড়ে বই পড়া কেন কঠিন হয়ে উঠছে?
খবর জানা, পণ্যের রিভিউ দেখা কিংবা রান্নার প্রক্রিয়া শেখার জন্য এখন কয়েক মিনিটের ভিডিওই মানুষের প্রথম পছন্দ। অল্প সময়ে বেশি তথ্য পাওয়া এবং দৃশ্যমান উপস্থাপনার সুবিধা থাকলেও, এর একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। দ্রুত এক কনটেন্ট থেকে অন্য কনটেন্টে যাওয়ার এই অভ্যাস দীর্ঘ সময় ধরে কোনো একটি বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখাকে কঠিন করে তুলছে।

ভিডিও নিজে থেকেই এগিয়ে চলে, কিন্তু বই পড়ার ক্ষেত্রে পাঠককে নিজেই মনোযোগ বজায় রাখতে হয়। গল্পের চরিত্র, পটভূমি বা জটিল বিষয় বুঝতে সময় দিতে হয় এবং সব পৃষ্ঠায় চমক না থাকলেও ধৈর্য ধরে পড়া চালিয়ে যেতে হয়। এর ওপর মুঠোফোনের নোটিফিকেশন ও মেসেজের আকর্ষণ তো রয়েছেই। সামান্য পড়ার পরিকল্পনা নিয়েও ফোন হাতে নিলে দীর্ঘ সময় কেটে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকেরই রয়েছে।

মনোযোগ ও ছোট ভিডিও নিয়ে গবেষণার কি বলছে?
স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও ব্যবহারের সঙ্গে জ্ঞানীয় সক্ষমতা ও মনোযোগের সম্পর্ক নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে।

Psychological Bulletin (২০২৫): ৭১টি গবেষণার সমন্বয়ে করা এই বিশ্লেষণে প্রায় ৯৮ হাজার মানুষের ডেটা খতিয়ে দেখা হয়। এতে দেখা যায়, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও ব্যবহারের সঙ্গে তুলনামূলক দুর্বল জ্ঞানীয় সক্ষমতা—বিশেষ করে মনোযোগ ধরে রাখা এবং অপ্রাসঙ্গিক উদ্দীপনা উপেক্ষা করার দক্ষতার ঘাটতির একটা সম্পর্ক রয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, এটি সরাসরি কারণ-ফলাফল প্রমাণ করে না; বরং যাঁদের আগে থেকেই মনোযোগে সমস্যা থাকে, তাঁরা হয়তো ছোট ভিডিওর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হন।

JAMA Network Open (২০২৬): এই গবেষণায় তরুণ-তরুণীদের ফোন ব্যবহারের ক্ষতিকারক দিক এবং চিন্তা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার কিছুটা দুর্বল সম্পর্ক পাওয়া যায়।

গবেষণাগুলো নিশ্চিত করে না যে রিলস বা শর্টস দেখলেই মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হয়, তবে এটি আমাদের ডিজিটাল অভ্যাসের প্রভাব নিয়ে ভাবার খোরাক জোগায়।

বই পড়ার দীর্ঘমেয়াদি সুফল
কেমব্রিজ, ওয়ারউইক ও ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ছোটবেলায় আনন্দের জন্য বই পড়া শুরু করেছিল, তাদের জ্ঞানীয় পরীক্ষা ভালো করা এবং শিক্ষাগতভাবে এগিয়ে থাকার প্রবণতা বেশি থাকে। পরবর্তী জীবনেও তাদের মনোযোগ ভালো থাকা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা কম হওয়ার যোগসূত্র দেখা গেছে।

বই পড়ার বড় সৌন্দর্য হলো, এতে পাঠককে নিজে কল্পনা করতে হয়, থেমে ভাবতে হয় এবং নিজের গতিতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে। এটি শুধু তথ্য নেওয়ার মাধ্যম নয়, বরং কল্পনাশক্তির চর্চা ও মানসিক প্রশান্তির দারুণ এক উপায়।

যেভাবে ফিরিয়ে আনা যায় পড়ার অভ্যাস
পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য ভারী কোনো উপন্যাস দিয়েই শুরু করতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। ছোটগল্প, কবিতা, বিজ্ঞান, জীবনী, ভ্রমণকাহিনি কিংবা কমিকস দিয়েও যাত্রা শুরু করা যেতে পারে।

১) প্রতিদিন মাত্র কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার লক্ষ্য স্থির করা।
২) অবসরে প্রতি মুহূর্তে ফোনে না ঝুঁকে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকা বা বইয়ের পাতা উল্টানো।
৩) ঘুমানোর আগে ফোন দূরে রেখে নির্দিষ্ট সময় বই পড়া।
৪) শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহের বিষয় বুঝে বই নির্বাচন করা এবং বড়দের নিজেদেরও পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।

প্রযুক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করে তাকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ই-বুক বা অডিওবুকের মাধ্যমেও পড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। মূল কথা হলো ডিজিটাল বিনোদন ও মনোযোগ দিয়ে পড়ার মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য তৈরি করা। পড়ার উপকরণ যতই সহজলভ্য হোক না কেন, দীর্ঘ লেখা বোঝার এবং গভীরে ডুব দেওয়ার জন্য বইয়ের পাতার বিকল্প নেই।

ডিআর