Image description

পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তার দুই ছেলে কাসিম ও সুলাইমান। তাদের দাবি, গত সাত মাস ধরে পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক ও আইনজীবীদের কেউই ইমরানের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে বাবার বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্যও তাদের কাছে নেই।

কাসিম ও সুলাইমান বলেন, ইমরানের বিষয়ে তাদের কাছে কোনো নতুন তথ্য নেই। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে পরিবার, চিকিৎসক ও আইনজীবীদের তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না।

ইমরানের মুক্তির দাবিতে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতাকর্মীরা। এসব কর্মসূচি থেকে ইমরান খান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবির মুক্তির দাবি জানানো হয়।

২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইমরান খান। ২০২২ সালে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে তার সরকারের পতন হয়। এরপর দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য প্রকাশসহ বিভিন্ন মামলায় তাকে সাজা দেওয়া হয়। তবে ইমরান ও তার সমর্থকেরা এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।

লন্ডন থেকে বাবার মুক্তির দাবি

ইমরানের দুই ছেলে বর্তমানে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বসবাস করছেন। বাবার কারাবন্দিত্বের পর থেকেই তারা তার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার।

কাসিম অভিযোগ করেন, গণমাধ্যমে বাবার বিষয়ে কথা বলার পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাদের ইমরানের সঙ্গে দেখা করার ক্ষেত্রে নানা বাধা তৈরি করা হয়েছে। ভিসা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তারা পাকিস্তানে যেতে পারছেন না বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় তাদের এই অভিযোগকে বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, কাসিম ও সুলাইমানের কাছে ওভারসিজ পাকিস্তানিজদের জন্য ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড রয়েছে, তাই পাকিস্তানে প্রবেশের জন্য তাদের ভিসার প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়।

তবে ইমরানের দুই ছেলে জানিয়েছেন, তাদের ওই পরিচয়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং তা নবায়ন করা হয়নি।

সাক্ষাতের অধিকার চায় অ্যামনেস্টি

ইমরান খান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবির পরিবারের সদস্য এবং আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাতের অধিকার পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

এক বিবৃতিতে সংস্থাটি পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের প্রতি তাদের পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ ‘নিঃশর্তভাবে পুনর্বহাল’ করার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত এবং কথিত একাকী বন্দিত্ব বন্ধ করারও দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

‘যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন’ থাকার অভিযোগ অস্বীকার সরকারের

ইমরান খানকে সাত মাস ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছে—তার পরিবারের এমন অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তান সরকার।

সরকারের দাবি, ইমরানের সঙ্গে তার পরিবার ও অন্যদের যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে। সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২১ মার্চ ইমরান তার এক ছেলের সঙ্গে সর্বশেষ ফোনে কথা বলেছেন।

পাকিস্তান সরকারের ভাষ্য, কারাগারের নিয়ম, আদালতের নির্দেশনা, অনুমোদিত সময়সূচি এবং নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় ইমরানের যোগাযোগ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। তবে তার সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি।

ইমরানের শারীরিক অবস্থা ‘স্থিতিশীল’: সরকার

ইমরানের শারীরিক অবস্থা নিয়েও নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে পাকিস্তান সরকার। সরকারের দাবি, তিনি সচেতন ও স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছেন এবং তার শারীরিক অবস্থায় গুরুতর কোনো অবনতি হয়নি।

সরকার আরও জানিয়েছে, ইমরান নিয়মিত চিকিৎসা, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তার ফলোআপও চলছে বলে দাবি করা হয়েছে।

কারাগারে ইমরানের থাকার পরিবেশ নিয়েও বিস্তারিত জানিয়েছে সরকার। তাদের ভাষ্য, তাকে সাত কক্ষের একটি বিশেষ কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে, যেখানে বিছানা, টেবিল-চেয়ার, স্যানিটেশন সুবিধা ও ব্যায়ামের সরঞ্জাম রয়েছে।

সরকারের দাবি, এসব ব্যবস্থা ইমরানকে বিচ্ছিন্ন, অবহেলিত বা শাস্তিমূলকভাবে রাখা হয়েছে—এমন অভিযোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

‘বাবার স্বাস্থ্য প্রতিবেদন দেখানো হচ্ছে না’

সরকারের বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন ইমরানের দুই ছেলে। কাসিমের অভিযোগ, তাদের বাবার কোনো স্বাস্থ্য প্রতিবেদন তাদের দেখানো হচ্ছে না। ফলে কারাগারে থাকার সময় তার শারীরিক অবস্থার কতটা অবনতি হয়েছে, তা তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না।

পিটিআইয়ের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন কাসিম। তার দাবি, দলটির অনেক নেতা-কর্মী এখনো সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক রয়েছেন এবং তাদের মধ্যে ৮৫ জনকে সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

সরকারের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা কম

ইমরান খান পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় যাবেন কি না—এ নিয়েও কথা বলেছেন তার দুই ছেলে।

সুলাইমানের মতে, অন্য রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির বিষয়ে কোনো সমাধান না হলে তার বাবা এককভাবে সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় যাবেন না। কাসিমও মনে করেন, ইমরানের সঙ্গে সরকারের সমঝোতার সম্ভাবনা কম। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা কঠিন বলেও জানান তিনি।

ইমরানের দুই ছেলের বক্তব্যের পর তার শারীরিক অবস্থা, কারাগারে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে পরিবারের অভিযোগের বিপরীতে পাকিস্তান সরকার বলছে, ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি এবং তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন।

সূত্র: সিএনএন