Image description

এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বয়ে চলা নজিরবিহীন তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রার প্রভাবে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে জাপান এবং হংকং থেকে চীন—সবখানেই প্রকৃতি এক রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। মাটির নিচে থাকা আলু অতিরিক্ত তাপে পচে ‘সেদ্ধ আলুর’ মতো হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে চিড়িয়াখানায় সিংহের মৃত্যু পর্যন্ত; জলবায়ু পরিবর্তনের এমন ভয়াবহ রূপ আগে কখনো দেখেনি এশিয়াবাসী।

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরে ইয়াংগু কাউন্টির আলচাষি লি সাং-হিয়ক তার ক্ষেতের অবস্থা দেখে বাকরুদ্ধ। তীব্র দাবদাহে মাটির উপরিভাগ এতটাই তপ্ত হয়ে উঠেছে যে, মাটির নিচে থাকা আলুগুলো পচে নরম হয়ে গেছে। স্থানীয় গণমাধ্যম এসবিএস-কে তিনি বলেন, “আলুগুলো দেখে মনে হচ্ছে মাটির নিচেই কেউ সেদ্ধ করে রেখেছে। এগুলো আর সংরক্ষণের উপায় নেই।”

দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইয়াংসানে গত ২ আগস্ট তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল, যা কোরিয়ার ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সরকারি তথ্যমতে, তীব্র গরমে এখন পর্যন্ত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং মারা গেছে প্রায় ২৩ লাখ গবাদিপশু ও খামারের মাছ। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং এই পরিস্থিতিকে ‘জাতীয় সংকট’ হিসেবে অভিহিত করে আবহাওয়া মোকাবিলার ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন।

জাপানেও এবার তাপপ্রবাহের তীব্রতা সব সীমা ছাড়িয়েছে। দেশটির অনেক স্থানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করায় আবহাওয়া বিভাগ ‘কোকুশোবি’ বা ‘নিষ্ঠুর গরমের দিন’ নামে নতুন একটি সতর্কবার্তা চালু করেছে। টোকিওর একটি চিড়িয়াখানায় অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তিনটি সিংহের মৃত্যু হয়েছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন না থাকলে জাপানে এমন ভয়াবহ তাপপ্রবাহ ১০ হাজার বছরে মাত্র একবার ঘটার সম্ভাবনা ছিল।

হংকংয়ে ১৮৮৪ সালে আবহাওয়া রেকর্ড রাখা শুরুর পর গত কয়েক দিনে সর্বোচ্চ ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অনুভূত হয়েছে। অন্যদিকে, চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়েও একের পর এক ‘উষ্ণ রাত’ পার করছেন বাসিন্দারা, যেখানে রাতের তাপমাত্রাও ২৫ ডিগ্রির নিচে নামছে না।

পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জলবায়ুবিজ্ঞানী জুন-ই লি বলেন, তিব্বত মালভূমি ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর তৈরি হওয়া শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় এবং ‘এল নিনোর’ প্রভাবে এ বছর এশিয়ার তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এশিয়ায় উষ্ণায়নের গতি গত তিন দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত না কমালে এমন চরম তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হবে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে এখনই দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা প্রয়োজন।

ডিআর