ইরানের জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের মান মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) বাজারদরে এক ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ লাখ ২০ হাজার রিয়ালে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতির মধ্যেই এই নজিরবিহীন দরপতন ঘটল।
ওয়াশিংটন জানিয়েছে, এই নতুন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য হলো ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেওয়া। এরই মধ্যে আগের নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে দেশটির অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটের মুখে রয়েছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত সরকারি হার প্রতি ডলারে ১৫ লাখ রিয়াল, তবে সাধারণ মানুষকে বাজারদর অনুযায়ী অনেক বেশি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর থেকেই রিয়াল দুর্বল হতে শুরু করে। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধ পরিস্থিতি অর্থনীতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে যে, চলতি সময়ে ইরানের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫ শতাংশের বেশি সংকুচিত হতে পারে।
মুদ্রার এই ব্যাপক অবমূল্যায়নের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে চালের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ এবং গরুর মাংসের দাম ১৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তেহরানের বাজারে ডলার কিনতে লাইনে দাঁড়ানো ৭৩ বছর বয়সী সাদেক মাহমুদি বলেন, “কোনো চুক্তি বা শান্তির আশা নেই, পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।”
ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট থাকলেও ইরান এখনই পিছু হটতে রাজি নয়। দেশটির বড় অস্ত্র কৌশলগত ‘হরমুজ প্রণালি’। বিশ্বের মোট পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যায়। ইরান প্রণালিটি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার হুমকি দিয়ে বলছে, জাহাজ চলাচলের জন্য তাদের অর্থ দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপরও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।
ট্রাম্প প্রশাসন সোমবার ঘোষণা করেছে যে, ইরানের সঙ্গে যারা বাণিজ্য অব্যাহত রাখবে, তাদের ওপরও ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প সরাসরি লিখেছেন, “ইরান পুরোপুরি ভেঙে পড়ছে!” এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে, যা তেহরানের জন্য বড় ধাক্কা।
চাপের মুখেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “আমাদের হাত বাঁধা নয়।” অন্যদিকে, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পাকিস্তান নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। সোমবার পাকিস্তানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল তেহরানে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে রিয়ালের ধারাবাহিক পতন এবং মূল্যস্ফীতি ইরানকে এক নজিরবিহীন সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের ওপর তেহরানের কৌশলগত প্রভাব এই সংকট কাটিয়ে উঠতে কতটা সহায়ক হয়।
সূত্র: এপি, সিএনএন।
ডিআর




Comments