জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে ভারতের দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ নির্ধারিত গন্তব্যে না গিয়ে জরুরি অবতরণ করে রাজস্থানের জয়পুরে। ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশের পর পাইলট যাত্রীদের জানান, নিরাপত্তার কারণে উড়োজাহাজটি দিল্লির পরিবর্তে অন্য একটি বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। আকস্মিক এ ঘোষণায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
গতকাল বুধবার সকালে এ ঘটনা ঘটে। বোয়িং ৭৮৭-৯ মডেলের এয়ার ইন্ডিয়ার এআই২০৩০ ফ্লাইটটিতে ২৯৩ জন যাত্রী ও ১৩ জন ক্রু ছিলেন। যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল সোয়া ৯টার দিকে তাঁদের জানানো হয়, নির্ধারিত গন্তব্যের পরিবর্তে জয়পুরে অবতরণ করা হবে। পরে নিরাপত্তা তল্লাশি শেষে উড়োজাহাজটি আবার দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা করে। বেলা ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে এটি দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩-এ পৌঁছায়।
জয়পুরে নেমে নিরাপত্তা তল্লাশি
উড়োজাহাজটির যাত্রীদের একজন গুরজিৎ সিং খালসা। ৪০ বছর বয়সী এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত জার্মান নাগরিক হিন্দুস্তান টাইমসকে জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উড়োজাহাজটি জয়পুরে অবতরণ করে। তার আগে প্রায় দুই ঘণ্টা যাত্রীদের উড়োজাহাজের ভেতরেই অপেক্ষা করতে হয়।
গুরজিতের ভাষ্য, অবতরণের পর তাঁদের জানানো হয়, নিরাপত্তা তল্লাশি করা হবে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ক্যাপ্টেন যাত্রীদের উড়োজাহাজ থেকে নেমে আসতে বলেন। বাইরে নেমে তাঁরা অনেক নিরাপত্তাকর্মী দেখতে পান। এরপর তাঁদের পাসপোর্ট দেখাতে বলা হয়।
গুরজিৎ অভিযোগ করেন, তাঁর নামের কারণে তাঁকে বাড়তি তল্লাশির মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার নামের কারণে আমাকে সব সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়। তাই এ ঘটনা আমার কাছে নতুন কিছু নয়।’
নিরাপত্তাকর্মীরা সব যাত্রীকে অপেক্ষা করতে বলেন এবং তাঁদের লাগেজ স্ক্যান করা হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর যাত্রীরা আবার উড়োজাহাজে ওঠেন। এরপর সেটি দিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়। গুরজিৎ আরও জানান, জয়পুরের একজন কর্মকর্তা তাঁকে বলেছিলেন, সেখানে ‘বোমার হুমকির মতো পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছিল।
‘ভেবেছিলাম ইঞ্জিনে সমস্যা হয়েছে’
ফ্লাইটটির আরেক যাত্রী ২৫ বছর বয়সী জানিস একজন মেডিক্যাল শিক্ষার্থী। সঙ্গীর সঙ্গে ছুটি কাটাতে তিনি দিল্লি যাচ্ছিলেন। হিন্দুস্তান টাইমসকে জানিস বলেন, উড়োজাহাজটি নিচে নামার সময় ক্রুরা গন্তব্য পরিবর্তনের কথা জানান। নিরাপত্তার কারণে সেটিকে জয়পুরে নেওয়া হচ্ছে বলেও জানানো হয়।
জানিসের বর্ণনা অনুযায়ী, অবতরণের পর উড়োজাহাজ থেকে নেমে তিনি অনেক অগ্নিনির্বাপণকর্মী দেখতে পান। প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো ইঞ্জিনে কোনো সমস্যা হয়েছে। পরে ভিন্ন ধরনের পোশাক পরা লোকজনকে দেখে নিরাপত্তাঝুঁকির আশঙ্কা করেন তিনি।
জানিসের সঙ্গীর মা তাঁদের কাছে একটি ভিডিও পাঠিয়েছিলেন। সেখানে উড়োজাহাজটি ‘ছিনতাই’ হওয়ার খবর প্রচার করা হচ্ছিল। ভিডিওটি দেখে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। জানিস বলেন, তাঁর সঙ্গীর মা খুব চিন্তিত হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা নিজেদের নিরাপদ থাকার কথা জানালে তিনি আশ্বস্ত হন। জানিসের ভাষ্য, এরপর সবকিছু স্বাভাবিকভাবে এগিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পেশাদারত্বের সঙ্গে পরিস্থিতি সামলেছেন।
উড়োজাহাজ থেকে পাঠানো হয়েছিল ‘৭৫০০’ সংকেত
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটির ট্রান্সপন্ডার থেকে ‘৭৫০০’ সংকেত পাঠানো হচ্ছিল। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই সংকেত ছিনতাই বা উড়োজাহাজে বেআইনি হস্তক্ষেপের পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হয়। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল সংকেতটি পাওয়ার পর উড়োজাহাজটিকে জয়পুরের দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
কেন এই সংকেত পাঠানো হয়েছিল, তা তদন্ত করবে ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল অধিদপ্তর (ডিজিসিএ)। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কারিগরি ত্রুটির কারণে ঘটনাটি ঘটতে পারে। তবে সমস্যাটি উড়োজাহাজের ব্যবস্থায়, নাকি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যবস্থায় ছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বোমার হুমকি নিয়ে ছড়িয়েছিল গুজব
ফ্লাইটটির আরেক যাত্রী সুনীতা রানির বয়স ৪৩ বছর। তিনি জার্মানিতে থাকেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে দিল্লি যাচ্ছিলেন। তাঁর দাবি, নিরাপত্তাসংক্রান্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে ক্রুরা যাত্রীদের বিস্তারিত কিছু জানাননি। তবে তাঁদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
হিন্দুস্তান টাইমসকে সুনীতা বলেন, যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ুক, ক্রুরা হয়তো তা চাননি। পরে তিনি জানতে পারেন, বোমার হুমকি নিয়ে গুজব ছড়িয়েছিল। যাত্রীদের শুধু জানানো হয়েছিল, নিরাপত্তা তল্লাশির জন্য উড়োজাহাজটি জয়পুরে অবতরণ করবে। এর বাইরে আর কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
যা জানাল এয়ার ইন্ডিয়া
এয়ার ইন্ডিয়া গতকাল বুধবার দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, নিরাপত্তাঝুঁকির আশঙ্কায় ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে দিল্লিগামী উড়োজাহাজটিকে জয়পুরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে এটি নিরাপদে অবতরণ করে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জয়পুরে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় তল্লাশি চালানোর পর উড়োজাহাজ ও ক্রুদের নিরাপদ ঘোষণা করে। সব যাত্রীকে উড়োজাহাজ থেকে নামিয়ে নিরাপত্তা তল্লাশি করা হয়। প্রক্রিয়া শেষ হলে তাঁরা আবার উড়োজাহাজে ওঠেন এবং পরে দিল্লিতে পৌঁছান।
এমআর




Comments