Image description

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গোষ্ঠীর মারামারি ও তিনটি হত্যাকাণ্ডের জেরে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বক্সগঞ্জ ইউনিয়নের আলীয়ারা গ্রামে। গ্রামজুড়ে এখন শুধুই ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। দুই পক্ষের অন্তত ২২টি মামলার জেরে দীর্ঘ সাত মাস ধরে গ্রামছাড়া প্রায় ২০০টি পরিবার। ঘরবাড়ীতে মানুষ না থাকায় পুরো গ্রামটি যেন এখন এক ‘ভূতুড়ে’ এলাকায় পরিণত হয়েছে। এদিকে ছেলে-মেয়েদের পড়া লেখা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার। 

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আলীয়ারা গ্রামে যুগ যুগ ধরে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। এই বিরোধ চরম রূপ নেয় গত বছরের ৩ আগস্ট। 

সেদিন আলাউদ্দিন মেম্বার নামের এক ব্যক্তিকে বাড়ির সামনে থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এই হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিপক্ষ ছালেহ আহমেদ গোষ্ঠীর লোকজনের বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় আলাউদ্দিন মেম্বারের পক্ষের লোকজন। যার ভয়ে ওই সময় তাদের পরিবারের সদস্যরা গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যান। এর ঠিক তিন মাস পর, চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি বিরোধ মিমাংসার কথা বলে ছালেহ আহমেদ গোষ্ঠীর লোকজনকে ডাকে আলা উদ্দিন মেম্বার পক্ষের লোকজন। 

স্থানীয়রা জানান, বৈঠক বসার আগে সকালের নাস্তা খাওয়ার সময় ছালেহ আহমদ মেম্বার ও নয়ন নামের যুবককে এলোপাতাড়ি গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই জোড়া খুনের পর পাল্টে যায় আলীয়ারা গ্রামের দৃশ্যপট। এবার আলা উদ্দিন মেম্বার গোষ্ঠীর প্রায় ২০০ পরিবারের লোকজন গ্রেপ্তার ও হামলার ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এই সুযোগে তাদের বাড়িঘরেও দেদারসে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় প্রতিপক্ষ। 

সরেজমিনে আলীয়ারা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামটি এখন পুরুষ ও নারীশূন্য। আলা উদ্দিন মেম্বার গোষ্ঠীর ঘরবাড়িগুলো লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে আছে। প্রতিটি ঘরের দরজা, জানালা ও বেড়ায় কোপানোর দাগ স্পষ্ট। ভবনের দেয়ালে প্রতিপক্ষের লোকজন লাল কালিতে লিখে দিয়েছে ‘খুনি’। 

আঙিনায় থাকা খড়ের স্তূপ পুড়ে ছাই হয়ে আছে। দীর্ঘ সাত মাস ধরে জনমানবহীন থাকায় ঘরগুলোর ভেতর ও বাড়ির উঠানে গজিয়ে উঠেছে আগাছা আর লতাপাতা। রান্নাঘরেও গাছের লতা উপচে পড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই তিনটি হত্যাকাণ্ডের জেরে নাঙ্গলকোট থানা ও আদালতে ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, চুরি ও হত্যাসহ অন্তত ২২টি মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশ বেশ কয়েকটি মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) ইতোমধ্যে আদালতে দাখিল করেছে। অনেক আসামি জামিনে থাকলেও প্রতিপক্ষের দেশীয় অস্ত্রের মুখে গ্রামে ফিরতে পারছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। গ্রামের সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন সেনাবাহিনী, পুলিশ, ডিবি ও র্যাব মোতায়েন করেও যে বিরোধ থামানো যায়নি, সেই রক্তক্ষয়ী হানাহানি শেষ হবে কবে?

ভুক্তভোগী আলীয়ারা গ্রামের স্বপন, আমিনূল, শাহলাম ও আইয়ূব খাঁনসহ অনেকে বলেন, সাত মাস ধরে পরিবার নিয়ে আমরা গ্রাম ছাড়া। জামিন পাওয়ার পরও নিজ বাড়িতে ফিরতে পারছিন না। গ্রামে ঢুকতে গেলে প্রতিপক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাধা দিচ্ছে। আমাদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। 

প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েও কোনো কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি। ঘরবাড়ি ছেড়ে পরিবার নিয়ে এখন চরম মানবেতর জীবনযাপন
করছি।

অপরদিকে ছালেহ আহমদ মেম্বার গোষ্ঠির মামুন বলেন, আবারও হামলা ও লুটপাটের উদ্দেশ্য দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে তারা গ্রামে ঢুকতে চাচ্ছে। আাামাদের ২ জনকে তারা প্রকাশ্যে হত্যা করেছে। বিচার না হওয়া পর্যন্ত কোন খুনিদের ছাড় দেয়া হবে না। আমরা হত্যাকারীদের উপযুক্ত বিচার চাই। 

এ বিষয়ে নাঙ্গলকোট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুর আলম বলেন, দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধ। এর জেরে দুই পক্ষের তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। জামিনপ্রাপ্তদের গ্রামে ফিরতে বাধা দেয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে ওসি বলেন, একটি পক্ষ বাড়িতে ওঠার চেষ্টা করলে পুলিশ সেখানে যায়। আমাদের কাছে তথ্য ছিল সেখানে অবৈধ অস্ত্রধারী এবং বিভিন্ন মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি রয়েছে। এলাকায় যাতে নতুন করে কোনো সংঘর্ষ না ঘটে, সেজন্যই পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আইনের চোখে সবাই সমান, পুলিশ কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করছে না।