বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামো পাল্টে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সে সময় একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয়েছিল, যার আওতায় হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া বাকি সব সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সময়ে দুর্নীতি, লুটপাট ও চুরি-ডাকাতির ঘটনা নিয়ে জনমনে গভীর অসন্তোষ ও আতঙ্ক দানা বাঁধছিল। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা ও নেতাকর্মীদের বিচারব্যালট বহির্ভূত গ্রেপ্তার-হত্যার প্রতিবাদে কয়েকটি চরমপন্থী সংগঠন সরকারবিরোধী তৎপরতা জোরদার করেছিল। আগস্টের কয়েক মাস আগেই শেখ মুজিবের ওপর একবার হামলার চেষ্টা হয়েছিল বলে সে সময় ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস ওয়াশিংটনকে অবহিত করেছিল।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, তখনকার পরিস্থিতি ছিল রীতিমতো নিঃশ্বাসরুদ্ধকর। নিয়মতান্ত্রিক পথে সমস্যার সমাধান না দেখতে পেয়েই সম্ভবত সেনাবাহিনীর একাংশ ক্ষমতা দখলের পথ বেছে নিয়েছিল।
অর্থনৈতিক অনিয়ম ও লুটপাটের চিত্র
স্বাধীনতার পর অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎকালীন সরকার হিমশিম খাচ্ছিল। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নেয় বলে সে সময়কার বিভিন্ন লেখা ও স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। ত্রাণসামগ্রী প্রকৃত অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছানোর বদলে পথেই তা চুরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ছিল ব্যাপক। দুর্নীতি ও চোরাচালান দমনে একপর্যায়ে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানো হলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দলের অনেক স্থানীয় নেতা-কর্মীও এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। এ নিয়ে তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দলীয় নেতাদের সংঘাত বাধে, আর দলীয় চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত সেনা সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণার জন্ম দেয় যে, সরকার নিজ দলের অনিয়ম বন্ধে প্রকৃতপক্ষে আন্তরিক নয়। ফলে দুর্নীতি আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। এমনকি সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে খাদ্যশস্য লুটের ঘটনাও সে সময়ের সংবাদপত্রে ছবিসহ প্রকাশিত হয়েছিল, আর পরিবহনের সময় বিপুল পরিমাণ শস্য পথেই উধাও হয়ে যাওয়ার খবরও ছাপা হয়েছিল। একটি প্রভাবশালী দৈনিকের সম্পাদকীয়তেও তখন লেখা হয়েছিল, সমাজের প্রতিটি স্তর দুর্নীতির শিকার, এমনকি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের জন্য বরাদ্দকৃত শত শত চেকও আত্মসাৎ করা হয়েছিল।
আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ও চরমপন্থী দমন
দুর্ভিক-পরবর্তী সময়ে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও দ্রুত খারাপ হতে থাকে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় প্রায় প্রতিদিনই চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছিল। বাড়িঘরের পাশাপাশি ট্রেন ও নৌযানেও নিয়মিত ডাকাতির খবর প্রকাশিত হতো। ১৫ আগস্টের মাত্র চার দিন আগে একটি দৈনিকে প্রকাশিত খবরে উল্লেখ ছিল, উত্তরাঞ্চলের একটি রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী ট্রেনে ডাকাতির সময় শতাধিক গুলি ছোড়া হয়, যাতে দুই যাত্রী নিহত ও অন্তত বাইশজন আহত হন।
১৯৭৫ সালের শুরুতে একটি চরমপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতাকে পুলিশি অভিযানে হত্যা করা হলে সংগঠনটি সহিংসতা আরও বাড়িয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বিশেষ বাহিনী চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালায়। শেখ মুজিব নিহত হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে প্রকাশিত এক খবরে জানানো হয়েছিল, ঝিনাইদহের একটি এলাকায় অভিযানের সময় গোলাগুলিতে চার চরমপন্থী নিহত ও একজন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
প্রকৃতির প্রতিকূলতা ও সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্ষোভ
আগের বছরের দুর্ভিক্ষের ক্ষত তখনো শুকায়নি। কৃষকদের আরও বেশি জমিতে ধান চাষে উৎসাহিত করা হলেও খরা ও পরবর্তী সময়ে টানা বৃষ্টি ও বন্যার ফলে ফসলহানি এবং প্রাণহানি বেড়ে যায়। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, সে সময় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরেও অসন্তোষ জমছিল। দলীয় চাপে সেনা সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত, একদলীয় শাসনব্যবস্থা মেনে নিতে না পারা এবং পদোন্নতি-সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ বিরোধও অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে। এ ছাড়া একটি বিশেষ আধা-সামরিক বাহিনীকে আধুনিক অস্ত্র ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে গড়ে তোলার গুজব সেনাবাহিনীর সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
১৪ আগস্ট: রাষ্ট্রপতির শেষ কর্মদিবস
১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে নিয়মমাফিক কাজ চলছিল। কর্মকর্তারা একে অন্যের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছিলেন, মন্ত্রীরা বৈঠক করছিলেন। পরদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল পুরোদমে। দিনভর নানা কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও শেখ মুজিবের মনে পড়ে পরিচিত আতাউর রহমান খানের অসুস্থতার কথা। সকাল ১১টার দিকে রাষ্ট্রপতি তার সহকারী একান্ত সচিব শাহরিয়ার ইকবালকে বলেন, তার মেয়েদের যেন আসতে বলা হয়। তারা এলে শেখ মুজিব স্নেহের সঙ্গে তাদের অভ্যর্থনা জানান।
বিকেল গড়িয়ে অফিসের ব্যস্ততা যখন কিছুটা কমতির দিকে, মুজিব গণভবনের লেকের পাশে গিয়ে বসেন। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুর আসেন। কাছেই বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলে শেখ রাসেল সাঁতার শিখছিল। কিছুক্ষণ পর সাঁতারের প্রশিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে ভেজা শরীরেই বাবার সামনে এসে দাঁড়ায় সে। মুজিব ছেলেকে বলেন, ‘ইনি তোমাকে সাঁতার শেখাচ্ছেন, সে জন্য তাঁকে তোমার কিছু উপহার দেওয়া উচিত।’ অফিস ছাড়ার আগে শাহরিয়ারকে ১৫ আগস্ট সকালে সরাসরি তার বাসভবনে যেতে বলেন মুজিব। ৩২ নম্বরের বাসভবন থেকেই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল শাহরিয়ারের।
অভ্যুত্থানের নীলনকশা ও হত্যাকাণ্ড
অভ্যুত্থানের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত হন একজন সেনা কর্মকর্তা। দেশের ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার তাঁকে ক্ষুব্ধ করেছিল। পরিকল্পনাকারীরা আওয়ামী লীগের একজন মন্ত্রীর কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পান। ঘটনার আগের দিন অভ্যুত্থানকারীরা রাষ্ট্রপতির বাসভবন রেকি করেন। রাতে নিয়মিত মহড়ার অজুহাতে ট্যাংক ও অস্ত্র নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে সমবেত হন তাঁরা। ভোররাতে তাঁরা বাসভবনে হানা দিয়ে রাষ্ট্রপতিকে পরিবারসহ হত্যা করেন।
পরবর্তী বিভীষিকা: প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান
পরবর্তীতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে অবসর নেওয়া তৎকালীন মেজর এম সাখাওয়াত হোসেন সেদিন সকালে ৩২ নম্বরের ওই বাড়িতে যান। বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর নাকে পোড়া বারুদের গন্ধ এসে লাগে। তিনি বঙ্গবন্ধুর সাবেক নিরাপত্তাপ্রধান কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদের মরদেহ দেখতে পান। সাখাওয়াত লিখেছেন, ‘বারবার নাকে এসে লাগছিল লাশের গন্ধ। সিঁড়ির মাঝামাঝি এসেই সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখলাম—সিঁড়ির ওপরে পড়ে আছে বঙ্গবন্ধুর নিষ্প্রাণ দেহ।’ মুজিবের পরনে ছিল সাদা কুর্তা ও চেক লুঙ্গি। বুক ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল গুলির আঘাতে। ওপরের তলাতেও ভয়াবহ দৃশ্য অপেক্ষা করছিল। বেডরুমে ঢোকার মুখেই বেগম মুজিবের মৃতদেহ, তাঁর পাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কামাল, জামাল ও তাঁদের সদ্য বিবাহিত দুই বধূ এবং শিশু রাসেলের মৃতদেহ।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এম এ হামিদও ১৫ আগস্ট ওই বাড়িতে গিয়েছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, কামরার মেঝেতে এক সাগর রক্ত থপথপ করছিল। সদ্যবিবাহিত রোজী জামাল ও সুলতানা কামালের মরদেহ দেখে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান। সুলতানা কামালের কোল ঘেঁষে ছিল ছোট রাসেলের মৃতদেহ। এভাবে শেষ হয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত অধ্যায়ের।
রাজনৈতিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্নীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ—এই সব কিছুর জটিল সমন্বয়েই তৈরি হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির পটভূমি, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়।
ডিআর




Comments