জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ
সমৃদ্ধ ও নতুন বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব কূটনীতির শীর্ষ মঞ্চ জাতিসংঘে এক বিরল ও অভূতপূর্ব ইতিহাসের স্বাক্ষর রাখলো বাংলাদেশ। একই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণ দিয়ে এক নতুন নজির গড়েছেন তারেক রহমান। ভাষণে তিনি এক নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে জোর দাবি জানান। ফিলিস্তিনীদের অধিকার নিশ্চিত করাসহ শান্তি ও মানবিক বিশ্বের পক্ষে বাংলাদেশের সুদৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সংঘাত ভুলে একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
বিশ্ব কূটনীতির মঞ্চে বিরল ইতিহাস বাংলাদেশের
এদিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে এক অনন্য ও ঐতিহাসিক রেকর্ডের স্বাক্ষর রাখলো বাংলাদেশ। বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক পথ অনুসরণ করে একই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম এবং দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিয়ে বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে নতুন এক নজির স্থাপন করেছেন তারেক রহমান। গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বিকেল ৬:১৬ মিনিটে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মূল পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে নিজের ভাষণ শুরু করেন তিনি। দীর্ঘ ২১ মিনিটের বক্তব্য শেষে বিকেল ৬:৩৭ মিনিটে তাঁর ভাষণ সমাপ্ত হয়। এই দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণে তিনি বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ-বিগ্রহ, সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা নিরসনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণ, মানবিক ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্ব নেতাদের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য প্রদান এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাঁর বলিষ্ঠ উপস্থিতির মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চে তারেক রহমানের নতুন এক যুগের সূচনা ঘটলো।
তাঁর এই ঐতিহাসিক বক্তব্য প্রদানের সময় অধিবেশন কক্ষে তৈরি হয় এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক পরিস্থিতি। তারেক রহমান যখন মূল পোডিয়ামে ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন বিশ্বসভার ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের সভাপতির মূল আসনে বসা ছিলেন তারই সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ইতিপূর্বে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের গৌরবময় ইতিহাস থাকলেও, একই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়া এবং একই সময়ে নিজ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অধিবেশন পরিচালনা করার ঘটনা বৈশ্বিক কূটনৈতিক ইতিহাসে একেবারেই বিরল।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের এই অবিস্মরণীয় মুহূর্তকে কাছ থেকে দেখার জন্য জাতিসংঘের প্রধান গ্যালারিতে ছিল উৎসুক আমন্ত্রিতদের চোখধাঁধানো উপস্থিতি। বৈশ্বিক কূটনীতিকদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদেরা, দেশি-বিদেশি সিনিয়র সাংবাদিকগণ এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক এই প্ল্যাটফর্মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মুখ থেকে বাংলায় ভাষণ শোনার জন্য পুরো গ্যালারিজুড়ে প্রবাসীদের মাঝে তীব্র আগ্রহ ও আবেগ লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশ সময় গভীর রাতে হওয়া এই ভাষণে বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি যখন বাংলাদেশের দিকে, তখন প্রধানমন্ত্রী মূল পোডিয়ামে পা রাখতেই পুরো মিলনায়তনজুড়ে করতালি ও উষ্ণ সম্ভাষণে তাকে স্বাগত জানানো হয়।
জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ
জাতিসংঘ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মদানকারী সকলের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একইসঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বীর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রতিও তিনি গভীর শ্রদ্ধা জানান। জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে প্রধানমন্ত্রী নিজেকে স্মৃতিকাতর আখ্যা দিয়ে বলেন, এই মঞ্চে দাঁড়িয়েই তাঁর পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। একইভাবে আজ তিনিও বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ এবং একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা নিয়ে এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, বহুপাক্ষিকতা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও জলবায়ু অর্থায়ন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ নিশ্চিত করার ওপরও প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জনগণের কল্যাণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রসার, নারীর ক্ষমতায়ন, তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ওপর সরকারের অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেন।
শান্তিময় বিশ্ব ও কার্যকর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শুরুতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিকে অভিনন্দন জানান এবং সভাপতিকে দায়িত্ব পালনে সহযোগিতার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। সেইসঙ্গে বিদায়ী সভাপতি এনালেনা বেয়ারবক-কেও তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশ্বায়নের এই সময়ে বিশ্বের যে প্রান্তে যা কিছুই ঘটুক, প্রতিটি রাষ্ট্রেই কমবেশি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানবসৃষ্ট বিরাজমান সংঘাতের ফলে বর্তমানে অনেক দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ছে। তৈরি হচ্ছে মানবিক সংকট। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা-সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই হওয়া উচিত দ্বিপাক্ষিক কিংবা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি। আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব, এমন একটি মানবিক বিশ্বসমাজ, যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা। একে অপরের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়।
তিনি বলেন, শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিশ্বমানবতা এবং বিশ্বশান্তির প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের যেকোনো উদ্যোগের পক্ষে বাংলাদেশের সমর্থন আমি আজ আবারও পুনর্ব্যক্ত করছি। স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায় তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল। 'পিসবিল্ডিং কমিশন'-এর ভাইস-চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি, সংঘাত প্রতিরোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ বিষয়ক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।
বাংলাদেশ এ বছর ‘উন্নয়নের অধিকার বিষয়ক ঘোষণা’র ৪০তম এবং ‘ডারবান ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা’র ২৫তম বার্ষিকী পালন করছে। অভিবাসন প্রক্রিয়া মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। বিশ্বের অনেক দেশেই অভিবাসীগণ তাদের জন্মভূমি এবং অভিবাসিত দেশ—উভয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশ সরকার নিয়মিত, নিরাপদ, সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও জোরালো বৈশ্বিক সহযোগিতা আশা করে।
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের আহ্বান
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশকে দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হচ্ছে। এর ফলে আমাদের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জনবহুল বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান। এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধানের জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় এবং কার্যকর সমর্থন প্রত্যাশা করে। পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার জন্যও আমি জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে এটি এক মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা উপস্থাপন
জলবায়ুর ন্যায়বিচার দাবি
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের তেমন ভূমিকা না থাকলেও বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশ ঝুঁকি মোকাবিলা করে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনের পথ বেছে নিয়েছে। সুতরাং, ক্লাইমেট জাস্টিস, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কপ-৩১-এ আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ আশা করে। বাংলাদেশে পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার কর্মসূচি জোরদার করেছে। এরই অংশ হিসেবে সরকার আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি শুরু করেছে। ক্লিন এনার্জি এবং সোলার এনার্জি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দেশকে বন্যা-খরার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ 'সুন্দরবনে' মিঠা পানির প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বৃহৎ জলাধারের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও শুরু করেছে। একইসঙ্গে পানি সংরক্ষণ ও দূষণ রোধে অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ জোরদার করার পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে সরকার ১৯৯২ সালের ‘ওয়াটার কনভেনশন’ স্বাক্ষর করেছে।
তারেক রহমান আরও বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের শাসন-শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য সরকার রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন অর্থাৎ 'থ্রি-আর' কৌশল অনুসরণ করছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে 'ম্যানুফ্যাকচারিং হাব' হিসেবে গড়ে তুলতে বিস্তারিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই কর্মযজ্ঞে বাংলাদেশ তাঁর উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে পেতে চায়। দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক এবং উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে দিতে সরকার চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে।
নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। ফলে দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীরা সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন। নারী শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের জন্য সরকার নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে। স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে। এ সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধির সুফলের লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ডের মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে। প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা 'ফ্যামিলি কার্ড'কে সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করে। কার্ডগুলোকে সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করাও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।
তারেক রহমান তাঁর সরকারের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচি সরকার বাস্তবায়ন করে চলেছে। জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজির উদ্দেশ্যের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির কমপক্ষে ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ কার্যক্রমের পরোক্ষভাবে মিল রয়েছে। সরকার আশা করে, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শহর এবং গ্রামের মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য দূর হবে এবং একইসঙ্গে ২০৩০ এজেন্ডার সব ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্পোর্টসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবার শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নৈতিক মানসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কারিগরি এবং ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই গড়বে আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ। আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বায়ো-টেকনোলজি এবং বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি। প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তবে এর সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে। বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রায় কোনো দেশ যেন পিছিয়ে না থাকে। সবার জন্য ন্যায্য ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশ এবং দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল যাতে দেশে দেশে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়, এ ব্যাপারে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
এলডিসি প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত দেশ’-এর তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য সকল দেশের ক্ষেত্রে এই উত্তরণ প্রক্রিয়াটিকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোতে ধারাবাহিক সহায়তা অপরিহার্য। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিটি দেশ একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ মনে করে, বিশেষ করে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাণিজ্য সহায়তা ও সম্প্রসারণ, কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থবহ সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা একে অপরের সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করতে পারি। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকা, চিকিৎসা-সামগ্রী ও রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জামের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে তাঁর সরকার কাজ করছে, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে এবং প্রতিটি শিশু তার সকল সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে। সর্বোপরি, জনগণ একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা পাবে। ভাষণের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ে তুলতে জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।




Comments