দেশে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকি দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং বৈশ্বিক কারণে পণ্য আমদানিতে বাধা—এই তিন কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতিসুদের হার ৯ দশমিক ৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে উৎপাদন খাত ও বন্ধ শিল্পকারখানা সচল করতে ঋণের জোগান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। এ সময় ডেপুটি গভর্নর সারোয়ার হোসেন ও আনিছুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এবারই প্রথমবারের মতো ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগে ছয় মাস পরপর মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হতো। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মুদ্রানীতিকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও এর ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার ঝুঁকি এখনো রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং আমদানিতে বৈশ্বিক প্রতিবন্ধকতার কারণে পণ্য ও সেবার দাম বাড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে পণ্য পরিবহনে বাধার কারণে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে নীতিসুদের হার ৯ দশমিক ৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। গত আগস্টের শুরুতে নীতিসুদের হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছিল। সুদের হার কমানোর ফলে ব্যাংকঋণের সুদও কমতে শুরু করেছিল। তবে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কায় আপাতত সুদের হার কমানোর পথ থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মূল্যস্ফীতির হার কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে রয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে এসেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে মুদ্রানীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন মুদ্রানীতিতে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধীরগতির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এখনো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি এবং শিল্প উৎপাদনেও আগের গতি ফিরে আসেনি। শিল্প উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ ও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো প্রত্যাশিত মাত্রায় সক্রিয় হয়নি।
তবে নতুন অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এসব খাতে কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে। তারপরও ঋণের উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দেশি-বিদেশি চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে রয়েছে।
এ অবস্থায় উৎপাদন খাতে ঋণের জোগান বাড়ানো এবং বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি ব্যাংক খাতের সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে পুনর্গঠন, মূলধন বৃদ্ধি এবং ঋণশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এসএস




Comments