বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০২৪, ২০২৫ এবং ২০২৬ সাল নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুঃশাসন, অত্যাচার, হয়রানি শেষে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকারের পরিবর্তন, অন্তর্বর্তী শাসন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি এখন রাষ্ট্র পরিচালনায়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে বহুগুণ। তাই এখন আর আন্দোলনের অথবা ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় কতটা দক্ষতা, সততা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় দিতে পারে—সেটা।
যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, তিনি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মতোই ন্যায়পরায়ণতায় দেশ পরিচালনা করবেন। নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। একইসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদও গঠন হয়েছে। কয়েকদিন আগে সর্বজনগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিপরিষদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা। সেইসঙ্গে সাধারণ জনগণের আকাঙ্ক্ষা বুঝে বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য বজায় রাখা।
এই তিন কাঠামোয় ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে সাধারণ জনগণের কল্যাণ সাধনই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। স্পষ্টতই তারেক রহমান মন্ত্রিপরিষদের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন—সেই লক্ষ্যে কিছু দক্ষ ও দায়িত্বশীল মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীও আমরা মন্ত্রিপরিষদে দেখছি। যদিও ছয় মাস মন্ত্রিপরিষদ নিয়ে মন্তব্য করার জন্য খুবই অল্প সময়। এরই মধ্যে আমরা মন্ত্রিপরিষদে রদবদল দেখেছি। সামনের সময়ে হয়তোবা প্রধানমন্ত্রীকে সঠিকভাবে দেশ পরিচালনার স্বার্থে আরও কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হতে পারে। এবং সেগুলো যত দ্রুত সময়ে করা যায়, ততই মঙ্গলজনক।
এদিকে অনেক মন্ত্রী আমলাতান্ত্রিক সমস্যার কথাও বলছেন। এটার সমাধান কীভাবে হবে এবং কত দ্রুত করা যায়, সেটা দেখার বিষয়। যদিও আমলাতান্ত্রিক সমস্যা সমাধানের জন্য কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।
বিএনপি একটি ঐতিহাসিক এবং বড় দল। ফলে দলীয় নেতাকর্মীদের আচরণ বিএনপি সরকারের জন্য বড় কোনো ঝুঁকির কারণ কিনা, সেটাও দেখার বিষয়। তবে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা বিএনপির জন্য প্লাস পয়েন্ট বলা যেতেই পারে।
কয়েকদিন আগেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রুহুল কবির রিজভীকে। দলে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা, প্রভাব এবং গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। কাজেই দল সঠিকভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে রুহুল কবির রিজভী হতে পারেন তারেক রহমানের ট্রাম্পকার্ড।
বিএনপি যদি চাঁদাবাজি, দখল, টেন্ডারবাজিতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে পারে, তাদের দল পরিচালনা অনেকটা সহজ হবে। বিএনপি সরকারের অনৈতিক কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজ, দখলদার, টেন্ডারবাজ, অযোগ্য নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এমন কিছু নীতি গ্রহণ করতে হবে, যার মাধ্যমে সাধারণ জনগণ বুঝতে পারবে সরকারের কাছে দলের চেয়ে দেশ বড়।
বিএনপির চারবারের রাষ্ট্র পরিচালনার যে অভিজ্ঞতা, সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তাদের সামনে ইতিহাস বদলের যে সুযোগ রয়েছে, তেমনই ব্যর্থতার দায় নেওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের দুঃশাসনের ফলে বিএনপি সরকার গঠন করতে না করতেই বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সংকটে পড়েছে। এই সংকট কতটুকু তীব্র হবে, সেটা দেখার বিষয় এবং আরও সংকট সামনে আসবে কিনা, সেটা নিয়ে সরকারের এখনই পর্যালোচনা শুরু করা উচিত এবং আগে থেকেই সমাধান বের করতে হবে।
কারণ, মানুষ এখন জানতে চায় না ক্ষমতায় কে? মানুষ জানতে চায়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ঠিকঠাকমতো পাবে কবে, ব্যাংকে টাকা নিরাপদ আছে কি না, ঘুষ ছাড়া চাকরি পাবে কি না, রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া সব ধরনের নাগরিক সুবিধা পাবে কি না?
কাজেই তারেক রহমান সরকারের সামনে এখন মূল পরীক্ষা ক্ষমতা ধরে রাখা নয়, সাধারণ জনগণের আস্থা অর্জন করা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক মানবকণ্ঠ




Comments