Image description

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান

প্রতি বছর ৭ নভেম্বর এলেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আলোচনার মধ্যমণি হয়ে ওঠেন। এর প্রধান কারণ হলো—১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর স্বাধীনতার ঘোষক ও মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে নেতৃত্বদানকারী অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঐতিহাসিক অভ্যুদয় দিবস। গভীর তাৎপর্যের সঙ্গে এটি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দিবসটিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস উদ্‌যাপন সংক্রান্ত পরিপত্রে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত জাতীয় দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে ছুটি পুনর্বহাল করেছে।

দিবসটির গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির পাশাপাশি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পূর্ব পর্যন্ত সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনতার স্বপ্ন কীভাবে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল, তা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের অব্যবহিত পরেই পেশাদারত্বের অনন্য বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল জিয়াউর রহমান নিজ পেশায় ফিরে যান। কিন্তু চার বছর অতিবাহিত না হতেই বাংলাদেশের রাজনীতি এক চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। এর অন্যতম কারণ ছিল—পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের অনুচরদের নির্যাতন ও গণহত্যার বিরুদ্ধে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলেও মুক্তিযোদ্ধাদের ভেতরে ছিল রাজনৈতিক বিভাজন ও নানা শিবিরে বিভক্তি। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে থিয়েটার রোডের নেতাদের দ্বন্দ্ব ছিল প্রায় প্রকাশ্য। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ১৯৭২ সালের ৮ মার্চ ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ’ জারির ফলে এই পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়। এই বাহিনী প্রথমে পুলিশের সহায়ক বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও পরবর্তীতে বিচারবহির্ভূত ক্ষমতা লাভ করে। অনেকেই মনে করেন, তাদের মূলত রাজনৈতিক সমালোচকদের দমনে ব্যবহার করা হতো (অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ, হাক্কানী পাবলিশার্স, পৃ. ৩৮-৩৯)। এতে তৎকালীন সরকার ও রাজনীতি সম্পর্কে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়।

সামরিক বাহিনীতে অস্থিরতা সৃষ্টির পাশাপাশি ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বাকশাল কায়েম করায় বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। সে সময় কোনো প্রকার নির্বাচন ছাড়াই সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়িয়ে নেওয়া হয়। তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা চারটি সংবাদপত্র ব্যতীত বাকি সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা চরমভাবে হরণ করা হয়। সরকারব্যবস্থাতেও মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়—সংসদীয় পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু করে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়। স্বাধীনতার পর স্বল্প সময়ের মধ্যে এমন একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য সদ্যমুক্ত জনগণ মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না। সামগ্রিক বিশৃঙ্খলার সুযোগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর কতিপয় ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে নিজেকে সেনাপ্রধান ঘোষণা করা হয়। সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় সে দিনই বঙ্গভবনে অবস্থানরত ১৫ আগস্টের ঘাতকদের নিরাপদে দেশত্যাগের সুযোগ দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা আনয়নের কথা বলা হলেও জনপ্রিয় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দি রাখায় সাধারণ সৈনিক ও জনতার মাঝে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠে জাসদ ও গণবাহিনী। গণবাহিনী প্রধান কর্নেল তাহেরের ভূমিকা মূল্যায়ন করতে গিয়ে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ উল্লেখ করেন, কর্নেল তাহের জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে যাননি; বরং তিনি গিয়েছিলেন খালেদ মোশাররফের উদ্যোগকে নস্যাৎ করতে। সে সময় দেশপ্রেমিক জনতার মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয় যে, জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা না গেলে দেশ চরম নৈরাজ্য ও সংঘাতের মুখে পড়বে।

এরই ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বর ভোরে রাজপথে নেমে আসে সিপাহী-জনতা। অবসান ঘটে জিয়াউর রহমানের বন্দিদশার। মুক্ত হয়ে তিনি কোনো প্রতিশোধপরায়ণ আচরণ করেননি; বরং পরিচয় দেন এক বিচক্ষণ অভিভাবকের। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে খালেদ মোশাররফ তাঁকে বন্দি করলেও ৭ নভেম্বরের পটপরিবর্তনের সময় জিয়াউর রহমান খালেদ মোশাররফ ও তাঁর সঙ্গীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক নওয়াজিশকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন (ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অব. সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশ: রক্তক্ষয়ী অধ্যায় ১৯৭৫-১৯৮১)। তবে ক্ষুব্ধ সিপাহীদের অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনার মুখে খালেদ মোশাররফসহ তাঁর সঙ্গীরা প্রাণ হারান।

কর্মজীবনে বারবার বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হয়েও জিয়াউর রহমান প্রতিহিংসার পথে না হেঁটে দেশকে একটি কার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বস্তরের গুণী মানুষদের সম্পৃক্ত করেন। তৎকালীন সময়ে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত জিয়াউর রহমানকে পদবঞ্চিত করে কে এম শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান করা হলেও তিনি পেশাদারত্বের সঙ্গে তা মেনে নিয়েছিলেন। গৃহবন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি বিভক্ত ও বিশৃঙ্খল সামরিক বাহিনীতে কঠোর হাতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনেন।

৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। এই পটপরিবর্তনের মাধ্যমেই দেশে উন্মুক্ত রাজনীতির পথ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। বহুদলীয় গণতন্ত্র ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া চালু হওয়ার ফলে রাজনৈতিক দলগুলো পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ পায়। জাতীয় পরিচয় নির্ধারণেও ৭ নভেম্বরের অবদান অনন্য। জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বিকশিত হয় ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ এবং প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ক্ষমতার বৃত্ত থেকে জন্ম নেওয়া সত্ত্বেও সব সংশয় দূর করে দলটি পর্যায়ক্রমে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। রাষ্ট্রক্ষমতাকে গণমুখী করার কারণেই অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিয়াউর রহমানকে তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক চুং হির মতো রূপান্তরকারী নেতৃত্বের সঙ্গে তুলনা করেন (এ. হোসেন, General Ziaur Rahman and the BNP: Political Transformation of a Military Regime, UPL, Dhaka, p. 17)। বিপরীতে, জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা বিপ্লবের প্রথম প্রহরেই ‘অফিসারদের রক্ত চাই’ স্লোগান দিয়ে অফিসার হত্যায় লিপ্ত হয়েছিল। সেই বিপ্লব প্রয়াসের অনেক নেতা পরবর্তীতে আদর্শিক অবস্থান ত্যাগ করে বিভিন্ন ধারার রাজনীতিতে বিলীন হয়ে যান।

রাষ্ট্রের দার্শনিক ভিত্তি কী হবে—সে বিষয়ে জিয়াউর রহমান একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন। বাহাত্তরের সংবিধানে নাগরিকের পরিচয় ‘বাঙালি’ নির্ধারিত হওয়ায় ভূখণ্ডে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও অবাঙালি জনগোষ্ঠী জাতীয় পরিচয়ের মূলধারা থেকে বাদ পড়ার ঝুঁকিতে ছিল। জিয়াউর রহমান সমতা ও অন্তর্ভুক্তির স্বার্থে সাংবিধানিক পরিভাষা হিসেবে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয় প্রবর্তন করেন। এটি কেবল একটি তাত্ত্বিক পরিবর্তন ছিল না, বরং তা ছিল সার্বজনীন দেশপ্রেমের স্মারক। ১৯৮১ সালে মার্কাস ফ্রান্ডাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “এটা আমাদের দেশ, আমাদের মাটি... এখন সুযোগ এসেছে উৎপাদনের চাকা সচল করার, শিল্প গড়ে তোলার এবং আত্মমর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার... আমাদের আস্থা রাখতে হবে নিজেদের শক্তিতে, কোনো পরনির্ভরশীলতায় নয়।”

একইভাবে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজনের মাধ্যমে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতির স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার ও জাতীয় পরিচয়ের আইনি ভিত্তি সুরক্ষিত করেছিলেন। আহমদ ছফা যথার্থই বলেছিলেন, “ইসলামের সম্ভাবনা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যোগহীন রাজনীতির কোনো ভবিষ্যৎ এদেশে নেই।” বিশিষ্ট লেখক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, বায়ান্ন কিংবা একাত্তরের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতি আঁকড়ে ধরে রেখে বাস্তবমুখী জাতিরাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব ছিল না; প্রয়োজন ছিল ধারাবাহিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সহনশীলতা ও জাতীয় ঐক্য। কিন্তু তৎকালীন সময়ে মতভিন্নতাকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে দেখার যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল, তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছিল।

বিগত দেড় দশকে দেশবাসী এক চরম দুঃশাসনের মুখোমুখি হয়েছিল। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, দুর্নীতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিরোধ এবং ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এই রূপান্তর সম্পন্ন হয়েছে।

এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের বড় দায়িত্ব এখন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। সরকারের দায়িত্ব পালনের সময়কাল এখনও সংক্ষিপ্ত হলেও তাদের গৃহীত সংস্কার উদ্যোগসমূহ ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক পথরেখা নির্দেশ করছে। তবে পরিবর্তিত এই প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে ঐতিহাসিক বয়ানগুলোর ইতিবাচক সমন্বয় সাধন করাই এখন রাজনীতির মূল চ্যালেঞ্জ।

ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) গঠনের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়া যেভাবে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে এগিয়ে নিয়েছিলেন, তা সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার অন্যতম দলিল। বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে সমমর্যাদার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রক্ষা, মুসলিম উম্মাহর সঙ্গে সৌহার্দ্য এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের নীতি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনে এই মুহূর্তে সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।