Image description

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় মোবাইল কোর্টের ধারণা আইন বিজ্ঞানে খুবই চমৎকার একটা আবিষ্কার। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও পাকিস্তানে বিচার বিভাগের অধীনে বিচারকেরাই মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। কিন্তু বাংলাদেশে প্রশাসন ক্যাডারের আমলারা সেটি দখল করে রেখেছেন। বাংলাদেশের প্রশাসন ক্যাডারের আমলারা প্রকৃতপক্ষে বিচারক বিভাগের বিচারিক। 

শেখ হাসিনার আমলে বেশিরভাগ অপরাধ সংক্রান্ত আইন মোবাইল কোর্ট আইনের সিডিউল ভুক্ত করা হয়েছে। বেশিরভাগ বিশেষ আইন (Special Law) এর অপরাধ বিচারে আলাদা আদালত বা ট্রাইবুনাল তৈরির বাধ্যবাধকতা পাশ কাটিয়ে বিচারকদের নতুন পদ সৃজন না করে বরং মামলার ভারে ভারাক্রান্ত বিচারকদের ঘাড়েই সেই সকল অপরাধ বিচারের ভার তুলে দিয়েছেন। যেমন: মাদকদ্রব্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী মাদকদ্রব্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ট্রাইব্যুনাল গঠন না করে মাদকের অপরাধের বিচার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের ঘাড়ে চেপে দিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায় ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুনাল গঠন না করে দেওয়ানী আদালতের ঘাড়ে চেপে দেয়া হয়েছে সেই কাজ। 

সাবেক প্রধান বিচারপতি খাইরুল হকের আইন কমিশনের চিন্তায় মনে হয় এটাই ছিল যে, এদেশের মানুষ বা মানুষের ন্যায় বিচার প্রাপ্তির অধিকার গোল্লাই যাক সমস্যা নাই কিন্তু শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে বিচারকদের উপর মামলার বোঝা চাপিয়ে দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের আমলাদের বিচারিক ক্ষমতা বাড়িয়ে দিতে হবে। আর শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সেটাই হয়েছে।  

বিচার কাজের সাথে আইন জেনে তা প্রয়োগের দক্ষতা এবং আইনের বুদ্ধিভিত্তিক চর্চায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এইজন্য আইন বিজ্ঞানে আদালতের একজন বিচারককে বলা হয় “Expert of All Expert”। কিন্তু দুঃখের বিষয় মোবাইল কোর্টের বিচারক হিসেবে একজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আইন বিজ্ঞান (Jurisprudence) ছাড়া বাকি সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ত। 

এছাড়া, পদ্ধতিগতভাবে মোবাইল কোর্টে বিবাদী বা তার কোন আইনজীবী থাকে না, তাই এই কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রচলিত আদালতের ম্যাজিস্ট্র্রটের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হতে হয়। আইন সম্পর্কে তার স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হয়। রাখতে হয় দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের অপেক্ষাকৃত নবীন কর্মকর্তারা এই দায়িত্ব পালন করে থাকেন। যেখানে দক্ষ বিচারক দরকার সেখানে নবীন কর্মকর্তাদের দিয়ে বিচারকাজ চালানো স্ববিরোধিতা বটে । জনকল্যাণ ও ন্যায় বিচারের স্বার্থে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার দায়িত্ব অতি শীঘ্র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের হাতে ছেড়ে দেওয়া আইনানুগ ও যুক্তিসঙ্গত হবে।

দেশের ডামি উন্নয়নের গল্প এবং মোবাইল কোর্টের সফলতার সাথে বিচার বিভাগের ব্যর্থতার একটি সমান্তরাল প্রহসন মূলক সমালোচনার চিত্র সাবেক সরকারের আমলারা অংকন করার চেষ্টা করেছেন। যা বিচার বিভাগের প্রতি প্রশাসন ক্যাডারের আমলাদের ষড়যন্ত্রের একটি নীল নকশা। কেননা বাংলাদেশে ভূমি সংক্রান্ত ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের মোকদ্দমার শতকরা ১০০ ভাগ এবং অন্যান্য দেওয়ানী আদালতের মোকদ্দমার প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ ভূমির খাজনা খারিজ সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং খতিয়ান প্রস্তুতে অবহেলা এবং হাস্যকর সব ভুলের কারণেই হয়। তাদের এই দায় এড়ানোর সুযোগ নাই। 

রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচারে ক্ষমতার বিভাজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হলেও শেখ হাসিনার আমলে বিচার বিভাগের বিচারকের রায় মেনে কাজ করার অনীহা মাঠ পর্যায়ের আমলাদের মধ্যে ব্যাপক দৃশ্যমান ছিল। খবরের কাগজে আমরা পড়েছি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বহু রায় বিশেষ করে নদী দখল এবং বালু মহলের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকেরা আদেশ মান্য করেন নাই। এছাড়াও সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল: সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পরও বিগত স্বৈরতান্ত্রিক সরকার উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মোবাইল কোর্টের ক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে।   

স্বৈরতান্ত্রিক সরকার আমলাদের তুষ্ট করার নীতি গ্রহণ করে আমরা এটা খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমলাদের তুষ্ট করতে গিয়ে বিগত আমলের স্বৈরশাসক হাসিনা বিচার বিভাগের বিচারকদের বিচার করার পরিধি কমিয়ে তা আমলাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বিচার বিভাগের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আমলাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। বিচারকদের গাড়ির নগদায়নের ফাইল জিম্মি হয়েছে নাকি আটকে আছে তা এখনো বিচারকেরা জানেনা। কারণ প্রশাসন ক্যাডার সব সময় তার সমতুল্য অন্যান্য ক্যাডারকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাদের মেরুদন্ড ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করেন। তিতা হলেও কথাটি সত্য। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক মেরুদন্ড নিজ হাতে ভেঙ্গে দিয়ে গেছেন এবং এ কাজে সরাসরি সহায়তা করেছেন কারা একটু খোঁজখবর নিলেই জানতে পারবেন। 

২০০৭ সালে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা হয়ে যাওয়ার পর থেকেই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ‘সব গেল সব গেল’ বলে রব শুরু হয়ে যায়। অথচ সংবিধান অনুযায়ী ১৯৭২ সাল থেকেই বিচার বিভাগের নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত হওয়ার কথা। সেটি দীর্ঘদিন ধরে কোনো সরকারই বাস্তবায়ন করে নাই বলে মাজদার হোসেনসহ বেশ কজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ১৯৯৫ সালে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা করেন। যার চুড়ান্ত রায় হয় ১৯৯৯ সালে। আর এর বাস্তবায়ন হয় ২০০৭ সালে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। তখন থেকে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের কিছু ক্ষমতা কমে যায়। তখন একদল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ‘জান দিয়ে হলেও’ তাদের বিচারিক ক্ষমতা ছাড়বেন না বলে হুমকি দিয়েছিলেন। এমনকি প্রশাসন অচল করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন তারা। এর ফলে তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার এক রকম চাপে পড়ে, আমলাদের সন্তুষ্ট করতে মোবাইল কোর্ট অধ্যাদেশ করেন যাতে ম্যাজিস্ট্রেটদের জরিমানা আদায়ের কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। 

এরপর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেই প্রথমে অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করে আমলাদের পকেটে বিচারিক ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয় এবং কোন প্রকার সাক্ষ্য প্রমাণের যাচাই বাছাই ছাড়াই এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এধরনের আদালতের কাছে দেশের জনগণ কতটা নিরাপদ তা খুব বড় একটা প্রশ্ন কারণ সাক্ষ্যের সত্যতা যাচাইকরণ বিচার ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা তাৎক্ষণিক বিচারে সম্ভব হয় না। তাই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের পরিচালিত মোবাইল কোর্টের এই ক্ষমতা আইনের অপব্যবহারের মাত্রা বিগত শাসন আমলে বেড়ে গিয়েছে এবং স্বৈরাচারী সরকারও তাদের দিয়ে ইচ্ছামাফিক বিচার আদায় করিয়ে নেওয়ার সুযোগ নিতে চেয়েছে, বিগত সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ভুয়া নির্বাচন চলাকালীন মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচারের হার যার বড় প্রমাণ।

এইসব দেখে মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের দেশে যুক্তির কথা শোনার লোক নাই বোধহয়? আমলারা ব্রিটিশ আমল থেকেই জনগণ ও রাজনীতিবিদদের উপর ছড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। সে ছড়ি তারা ছেড়েই-বা দিবেন কেন? এ কারণেই দেখা যাচ্ছে, আমলারা একের পর এক আবদার করে বা ছলেবলে তাদের ক্ষমতা সর্বক্ষেত্র বাড়িয়ে নিচ্ছেন।

আমলাদের খুশি রাখতে হোক কী তাদের চাপে নতি স্বীকার করেই হোক, এটা স্পষ্ট যে, শেখ হাসিনার আমলে প্রশাসন ক্যাডারের আমলারা সরকারের ঘাড়ে চেপে বসেছিল এবং শেখ হাসিনাকে তারা তাদের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল করে ফেলেছিল ফলে যেকোন রাষ্ট্রীয় সংকট নিরসনে শেখ হাসিনা জাতীয় বা রাজনৈতিক আপোষ সংলাপের মতো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অবজ্ঞা করে হয়ে উঠেছিল দানবীয় স্বৈরশাসক। 

তাই পরিশেষে বলতে চাই, ছাত্র জনতার রক্তের বিনিময়ে পাওয়া বর্তমান গণমানুষের সরকার সত্যি যদি গণতন্ত্র এবং মানুষের জন্য ন্যায় বিচার বিশ্বাস করেন তবে আমলাদের দ্বারা পরিচালিত অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী সরকারের দোসরদের পাস করা কালো আইন মোবাইল কোর্ট আইন বাতিল করবেন অথবা জেলা আদালতগুলোর অবকাঠামোগত দৈন্যদশা দূর করে বিচার বিভাগের বিচারকদের গাড়ির সুবিধা এবং প্রত্যেক আদালতে আলাদা বাজেট প্রদান পূর্বক মোবাইল কোর্ট আইন -২০০৯ সংশোধন করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার দায়িত্ব প্রকৃত বিচারকদের হাতে ছেড়ে দেবেন। (সম্মানিত পাঠক, শেখ হাসিনা সরকারের মোবাইল কোর্ট ও আমলাদের তোষণ সংক্রান্ত বিষয়ের ১ম, ২য় পর্বের ধারাবাহিকতায় এখন পড়লেন শেষ পর্ব)

লেখক: জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, নাটোর।