তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও জ্বালানি সংকটে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সারা দেশে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তবে বিদ্যুৎ বিতরণে চরম বৈষম্য দেখা দিয়েছে; মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৩৮ শতাংশই রাজধানীতে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে ঢাকা শহর তুলনামূলক সচল থাকলেও ঢাকার বাইরের জেলা ও গ্রামাঞ্চলে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এতে একদিকে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি সেচ ও শিল্প উৎপাদন।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার সন্ধ্যায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ১৫ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন কম হওয়ায় ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৫৮ মেগাওয়াট। তবে মাঠ পর্যায়ে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল আরও বেশি। একই দিনে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ১৯৩২ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও গত কয়েক দিনের গড় তথ্য বলছে, দেশের সর্বোচ্চ লোডশেডিং এখন ২ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত রবি থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা যথাক্রমে ৩৬.৩, ৩৬.৬ এবং ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বাসাবাড়ি ও কলকারখানায় এসিতে ও ফ্যানের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই তিন দিনই গড়ে ১৯০০ মেগাওয়াটের উপরে লোডশেডিং করতে হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিতরণে চরম আঞ্চলিক বৈষম্য লক্ষ্য করা গেছে। লোডশেডিংয়ের সময় বিবেচনায় সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে বরিশাল বিভাগ। সেখানে দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এরপর ক্রমান্বয়ে ভোগান্তির তালিকায় রয়েছে রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, ঢাকা বিভাগ (শহর বাদে), কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, সিলেট এবং রংপুর।
বিভাগীয় শহরগুলোর তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কয়েকগুণ বেশি। তবে রাজধানী ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় লোডশেডিং তুলনামূলক কম। ঢাকায় দৈনিক ১ থেকে ২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, এমনকি অনেক ভিআইপি এলাকায় লোডশেডিং প্রায় শূন্যের কোঠায়।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) ও পিডিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগে চাহিদা ও সরবরাহ সবচেয়ে বেশি হলেও এখানেই ঘাটতির পরিমাণ বেশি। তবে কৌশলী বণ্টনের কারণে ঢাকা শহরে লোডশেডিং গড়ে ২ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে। বিপরীতে অন্যান্য অঞ্চলে চাহিদা কম হলেও সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে বরিশাল অঞ্চল। এখানে চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। দিনে ৮-১০ বার বিদ্যুৎ গিয়ে ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত অন্ধকারে থাকছে মানুষ। রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলে দিনে ৬ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, যা শিল্পোৎপাদন ও কৃষি সেচকে স্থবির করে দিয়েছে।
চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা অঞ্চলেও একই চিত্র। চট্টগ্রাম শহরে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হলেও গ্রামীণ এলাকায় ১৬-১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা বিভাগের গ্রামাঞ্চল ও উপজেলাগুলোতে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এছাড়া ময়মনসিংহ, সিলেট ও রংপুর অঞ্চলেও গড়ে ৩ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে।
লোডশেডিংয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি শিল্প ও কৃষিতে।
শিল্প খাত: গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে ৪৮৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৩১২ মেগাওয়াট। ফলে দিনে ৬-৮ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে গার্মেন্টস ও কারখানার উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। পাবনা ও সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্পে উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে।
কৃষি খাত: বর্তমানে বোরো ধানের ভরা মৌসুম। নওগাঁ, নাটোর, কুমিল্লা ও কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় সেচ পাম্প চালাতে না পেরে কৃষকরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। কৃষি সেচ ব্যাহত হওয়ায় ধান উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এপ্রিলের মাঝামাঝিতেই যদি পরিস্থিতির এই অবনতি হয়, তবে মে ও জুনের চরম গরমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। জ্বালানি সংকট এবং উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা দূর করা না গেলে সামনের দিনগুলোতে লোডশেডিং আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।




Comments